০৮ জুলাই ২০২৬, ২১:৪৬

অনুমোদন ছাড়াই চলছে ডজনখানেক স্টাডি সেন্টার, অ্যাকশনে যাচ্ছে ইউজিসি

অনুমোদন ছাড়াই চলছে স্টাডি সেন্টার, অ্যাকশনে যাচ্ছে ইউজিসি  © সংগৃহীত

দেশে বসেই অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের প্রলোভন। আর এর জন্য প্রয়োজন শুধু মোটা অঙ্কের অর্থ। ব্যাচেলর থেকে পিএইচডি—সব ধরনের ডিগ্রিই পাওয়া যাবে, এমন প্রচারণা চালিয়ে আসছিল রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠান। ‘লিংকনস হায়ার এডুকেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ নামে ওই প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের ‘আমেরিকান ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া, ইউএসএ’-এর স্টাডি সেন্টার দাবি করে শিক্ষার্থী ভর্তি করছিল। তাদের বিজ্ঞাপনে ব্যাচেলর, মাস্টার্স, এমপিএইচ, এমবিএ, এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগের পাশাপাশি স্পেশাল স্কলারশিপ ও ক্রেডিট ট্রান্সফারের সুবিধার কথাও উল্লেখ করা হয়। মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি বাবদ ৫ হাজার ১০০ মার্কিন ডলার এবং পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য ১০ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। যে ‘আমেরিকান ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি’র নামে ভর্তি কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল, বাস্তবে এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেটি ২০১৪ সালে বাংলাদেশের নওগাঁ থেকে নিবন্ধন করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওয়েবসাইটে ব্যবহৃত একটি ছবি নেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে।

এদিকে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর শাহজালাল টাওয়ারে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য একটি কার্যালয়ও পরিচালনা করা হচ্ছিল। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নজরে এলে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি একটি ভুয়া স্টাডি সেন্টার, যা অস্তিত্বহীন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।

দেশে বিদ্যমান আইনে এ ধরণের স্টাডি সেন্টারের বৈধতা না থাকলেও অহরহ গড়ে উঠছে প্রতিষ্ঠান। চটকদার সব বিজ্ঞাপনে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মানুষের টাকা, আবার কেউ বা ভুয়া সার্টিফিকেট ও ডিগ্রি কিনে নিচ্ছেন তাদের কাছ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে বারবার সতর্ক করা হলেও থেমে নেই এসব কার্যক্রম।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বিভিন্ন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের নামে ডজনখানেক স্টাডি সেন্টার পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—আমেরিকান ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, ভূঁইয়া একাডেমি লিমিটেড, বিএসি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, লিডস একাডেমি, লন্ডন গভর্নমেন্ট কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজ নর্থ, ঢাকা ল একাডেমি, কিংস্টন ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি (কেআইএমটি), নিউ ক্যাসেল ল একাডেমি, ক্যামব্রিজ বিজনেস অ্যান্ড ল একাডেমি, ইউনিভার্সিটি অব ল (ইউকে), হার্ডফোর্ড কলেজ, ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি এবং ইনস্টিটিউট অব টিচার কম্পিটেন্সি অ্যান্ড এক্সিলেন্সসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিকেই স্টাডি সেন্টার পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে ইউজিসি। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা, ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার ও টিউটোরিয়াল সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে।

সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে ইউজিসি জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তালিকা তাদের হাতে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ‘বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার পরিচালনা বিধিমালা, ২০১৪’ অনুযায়ী অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদনের আবেদন না করলে কিংবা অনুমোদন ছাড়া কার্যক্রম চালিয়ে গেলে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে কমিশন।

ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি স্টাডি সেন্টার পরিচালনার অনুমোদনের জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল আমেরিকান ইউনিভার্সিটি, মনাশ কলেজ (অস্ট্রেলিয়া), লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (যুক্তরাজ্য) এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ বার্মিংহাম (ইউসিবি)। তবে আবেদন করলেই অনুমোদন মিলবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক মান, অবকাঠামো, শিক্ষক, পাঠ্যক্রম ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি যাচাইয়ের পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, সরকারের অনুমোদন ছাড়া কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের নামে বাংলাদেশে শাখা ক্যাম্পাস, স্টাডি সেন্টার বা টিউটোরিয়াল সেন্টার পরিচালনা করা যাবে না। আইনের ৩(৩) ধারায় বলা হয়েছে, অনুমোদন ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের নামে শিক্ষার্থী ভর্তি বা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে কোনো ব্রোশিওর, প্রসপেক্টাস, লিফলেট প্রকাশ বা প্রচার করা যাবে না। একই সঙ্গে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আইনের ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের নামে বাংলাদেশে ক্যাম্পাস স্থাপন, স্নাতক, স্নাতকোত্তর, ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালনা কিংবা কোনো ডিগ্রি, ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট প্রদান করা যাবে না।

এ ছাড়া ‘বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা ক্যাম্পাস বা স্টাডি সেন্টার পরিচালনা বিধিমালা, ২০১৪’ অনুযায়ী, অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক, অবকাঠামো, আর্থিক সক্ষমতাসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ইউজিসিতে জমা দিতে হয়। আবেদন যাচাইয়ের পর সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সুযোগ-সুবিধা মূল্যায়ন করা হয়।

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানের শাখা, ক্যাম্পাস কিংবা স্টাডি সেন্টার পরিচালনা বিধিমালার কোনো ধারা লঙ্ঘন করলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, আইনের নির্ধারিত ধারা লঙ্ঘন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক বেলাল আহমেদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত স্টাডি সেন্টার বা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাসকে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে সংরক্ষিত তহবিল, পর্যাপ্ত জায়গা, প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফ্যাকাল্টি, শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামো।

তিনি আরও বলেন, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। কোনো কারণে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসন ও বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বেলাল আহমেদ বলেন, দেশের সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ই অলাভজনক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় থেকে উদ্যোক্তারা কোনো উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যক্তিগতভাবে নিতে পারেন না। কিন্তু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে পরিচালিত অনেক স্টাডি সেন্টার বা শাখা ক্যাম্পাসে মধ্যস্থতাকারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মুনাফা ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা দেশের প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এ বিষয়ে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অনুমোদনহীন স্টাডি সেন্টার ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে পরিচালিত শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়ে কমিশনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ নিয়ে ইতোমধ্যে কিছু কাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে একটি নীতিমালা (পলিসি) প্রণয়নের কাজ চলছে। নীতিমালা চূড়ান্ত হলে এ বিষয়ে কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে জানানো হবে।