প্রথম কেমব্রিজ প্রিন্সিপালস মিট: এআইয়ে বিনিয়োগ ও শিক্ষায় ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা
দেশে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্য নিয়ে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে কেমব্রিজ প্রিন্সিপালস মিট-২০২৬। মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেলে রাজধানীর উত্তরায় গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল জুনিয়র ক্যাম্পাসে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে কেমব্রিজ কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেড় শতাধিক অধ্যক্ষ, স্কুল প্রধান ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের গ্লোবাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর রড স্মিথ, দক্ষিণ এশিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর অরুণ রাজামণি এবং দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। তারা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং শিক্ষার পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন এসটিএস গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মানস সিং। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থবহ শেখার পরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষকদের পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।
মানস সিং আরও বলেন, দেশের শিক্ষা খাতের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের একত্র করে এমন অর্থবহ আলোচনা ও মতবিনিময়ের পরিবেশ তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য। এর মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা আরও সমৃদ্ধ হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য আরও দক্ষ ও প্রস্তুত করে তোলা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে গ্রেনরিচ উত্তরার শিক্ষার্থীরা একটি মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করে। পরে মূল অধিবেশনে কেমব্রিজ বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা দেশে কেমব্রিজ শিক্ষাধারার সাম্প্রতিক অগ্রগতি তুলে ধরেন। আলোচনায় প্রাইমারি চেকপয়েন্ট পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের সাফল্য, পূর্ণাঙ্গ কেমব্রিজ কারিকুলাম অনুসরণকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষার বিস্তারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বক্তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা শুধু পরীক্ষাভিত্তিক ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, অংশগ্রহণমূলক এবং যুগোপযোগী পাঠদান পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
আলোচনায় উঠে আসে, আধুনিক শ্রেণিকক্ষে এমন শিক্ষণ কৌশল প্রয়োগ করতে হবে যা শিক্ষার্থীদের কৌতূহলী করে তুলবে, তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে এবং শেখাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করবে।
বক্তাদের মতে, এই ধরনের পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতাকে আরও অর্থবহ ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
এ সময় ভবিষ্যতে শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর এআইয়ের আধিপত্য নিয়েও আলোচনা করেন বক্তারা। তারা এআইয়ে বিনিয়োগ, একইসঙ্গে এথিকাল এআই প্র্যাকটিসের ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানে কেমব্রিজ ইংলিশ প্রোগ্রামের বিভিন্ন উদাহরণ ও কেস স্টাডি উপস্থাপন করে দেখানো হয়, কীভাবে এসব কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাস্তব জীবনে ভাষা ব্যবহারের সক্ষমতা গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগ সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নও ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আলোচ্য বিষয়। অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, শিক্ষার মান উন্নয়নে শুধু আধুনিক কারিকুলাম নয়, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে সহকর্মীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা অর্জন এবং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে কেমব্রিজ প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট কোয়ালিফিকেশনস (পিডিকিউ) কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, এই কর্মসূচি শিক্ষকদের আত্মমূল্যায়ন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বকে আরও কার্যকর করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একই সঙ্গে এটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের গুণগত মান উন্নয়নেও সহায়ক।
অনুষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ কেমব্রিজ শিক্ষাধারা অনুসরণকারী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি কেমব্রিজের অনুমোদিত ও মৌলিক শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে উৎসাহ জোগানো এবং পাইরেসি বিরোধী উদ্যোগে ভূমিকা রাখা স্কুলগুলোর অবদানের প্রশংসা করা হয়।
দিনব্যাপী বিভিন্ন অংশগ্রহণমূলক সেশন, আলোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শিক্ষাবিদরা আন্তর্জাতিক শিক্ষার নতুন প্রবণতা, উদ্ভাবনী পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার কার্যকর কৌশল সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন কেমব্রিজের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড সারওয়াত রেজা, গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যক্ষ অম্লান কে সাহা, অ্যাপল ট্রি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যক্ষ তাহসিনা রাসুল, চট্টগ্রাম গ্রামার স্কুলের ডিরেক্টর শিরীন ইস্পাহানি প্রমুখ।