১৬ জুন ২০২৬, ২১:০২

বিদেশে পড়তে গিয়ে ফিরছেন না বেশির ভাগ শিক্ষার্থী, নেপথ্যে উচ্চ বেতন-নিরাপদ জীবন

বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থী  © টিডিসি এআই সম্পাদিত

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’। বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে নতুন আশার জন্ম নিলেও, বাস্তবে সেই প্রবণতা খুব একটা দৃশ্যমান হয়নি। বরং পরিসংখ্যান বলছে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে স্থায়ীভাবে না ফেরার প্রবণতাও। ভালো বেতন, স্থিতিশীল জীবন ও উন্নত কর্মপরিবেশের আকর্ষণে দেশের সবচেয়ে মেধাবী অংশটি বিদেশে থেকে যাচ্ছে যাকে বিশেষজ্ঞরা দেখছেন মানবসম্পদ ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ হিসেবে।

ইউনেস্কোর তথ্য বলছে,  ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালে দ্বিগুণ হয়েছে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা। সবশেষ ২০২৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়েছেন ৫২ হাজার শিক্ষার্থী। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশিদের বিদেশে শিক্ষার ব্যয় ছিল ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। বাংলাদেশি মুদ্রায় ব্যয়কৃত এ অর্থের পরিমাণ ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। তবে এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে কতজন দেশে ফিরে আসেন তার কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে ধারণা করা হয়, সিংহভাগই আর দেশে ফিরে আসছেন না। 

ফিরে না আসার প্রবণতার পেছনে যেসব কারণ
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে আর দেশে না ফেরার প্রবণতা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে, ভালো বেতন, স্থিতিশীল জীবন, উন্নত কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা। ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার সবচেয়ে মেধাবী মানবসম্পদ। বিদেশে থাকা শিক্ষার্থী ও গবেষকদের অভিজ্ঞতা এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয় বরং দেশের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন আরিফ হাসান। উচ্চশিক্ষার জন্য ২০২১ সালে কানাডায় যান তিনি। বর্তমানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। দেশে ফেরার পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে আরিফ বলেন, আপাতত বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই তার। তিনি মনে করেন, পেশাগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার দিক থেকে বিদেশে দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি।

যদি দেশে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকত, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী বিদেশমুখী হতো না। গত তিন দশকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান সমানভাবে উন্নত হয়নি। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছেছে, কিছু মাঝামাঝি অবস্থানে আছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের মান এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। সামগ্রিকভাবে উচ্চশিক্ষার মান উন্নত করা গেলে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমবে।— অধ্যাপক ড. এম আর কবির, উপাচার্য, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

তিনি বলেন, অনেকেই শুধু উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে আসে, কিন্তু এখানে এসে তারা ভিন্ন বাস্তবতা দেখতে পায়। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা মানুষকে ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে পরিবার-পরিজন থাকলেও আমার পেশাগত ও ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ আপাতত এখানেই বেশি নিরাপদ বলে মনে হয়।

কানাডার অটোয়ায় বসবাস করছেন মাহিরা ইসলাম। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কানাডার একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেটা সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে ভর্তি হন। মাহিরা জানান, বাংলাদেশে এ বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা ও বিশেষায়িত শিক্ষার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়ায় বিদেশে পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একই সঙ্গে উত্তর আমেরিকায় আত্মীয়-স্বজন থাকায় নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়াও কিছুটা সহজ হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কো-অপ কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন। এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান। বর্তমানে তিনি একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন এবং একই সঙ্গে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

দেশে ফেরার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে মাহিরা বলেন, ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিভিন্ন কারণে আপাতত কানাডাতেই থাকার কথা ভাবছেন তিনি। তবে দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে ফিরে আসার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষার্থীরাই মূলত বিদেশে গিয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে। এতে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ বিদেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে, আর বাংলাদেশ সেই দক্ষতার প্রত্যক্ষ সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাঁর মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয় বরং দেশের কাঠামোগত বাস্তবতা, সুযোগ-সুবিধা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলনও।

ব্রেইন ড্রেনের কারণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে মানবসম্পদ বা হিউম্যান ক্যাপিটাল লস। সরকারের অর্থে ও সমাজের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই মেধাবীরা বিদেশে চলে যাওয়ায় দেশের গবেষণা, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। এর ফলে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনীতিতে যে ‘স্পিলওভার ইফেক্ট’ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা অনেকাংশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।—মাহমুদুল হাসান, শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। এক শ্রেণি মূলত বিদেশে স্থায়ী হওয়ার উদ্দেশ্যেই যায়, যেখানে উচ্চশিক্ষা একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আরেক শ্রেণি প্রকৃত অর্থে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে গেলেও শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসে না। ফিরে না আসার প্রধান কারণ হলো: জীবনমান, কর্মসংস্থান ও আয়ের বড় ব্যবধান। বিদেশে একজন মেধাবী যদি কয়েক লাখ টাকার সমপরিমাণ আয় করেন, আর দেশে এসে যদি তার তুলনায় অনেক কম বেতন পান, তাহলে তার ফিরে আসা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে যায়।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়, বরং দেশে বিদ্যমান সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক জটিলতা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ এবং স্বচ্ছতার ঘাটতির কারণে অনেকে দেশে ফিরতে আগ্রহী হন না। বিদেশে তারা যে স্বচ্ছতা, পেশাগত শৃঙ্খলা ও পূর্বানুমানযোগ্য কর্মপরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়, দেশে এসে সেই পরিবেশ না পেলে তারা অনাগ্রহী হয়ে পড়েন।

ফেরার পরও বাধার মুখে মেধাবীরা
বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফেরা বাংলাদেশি শিক্ষকদের অনেকেই কর্মক্ষেত্রে নানা ধরনের বাধার মুখোমুখি হন। গবেষক রুমানা হোসেনের ২০২১ সালের পিএইচডি গবেষণা ‘Experience of Bangladeshi Academics on Return from Study Abroad’ অনুযায়ী, বিদেশফেরত শিক্ষকদের নতুন জ্ঞান, গবেষণা পদ্ধতি ও আধুনিক শিক্ষাদান কৌশল প্রয়োগের প্রচেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে সহকর্মী ও প্রশাসনের অনীহা কিংবা প্রতিরোধের মুখে পড়ে। বিদেশি ডিগ্রিধারীদের সঙ্গে দেশে শিক্ষিত শিক্ষকদের মধ্যে পেশাগত প্রতিযোগিতা ও ঈর্ষাও একটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, দেশে ফিরে অনেক শিক্ষক পর্যাপ্ত গবেষণা তহবিল, আধুনিক গবেষণাগার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে নিজেদের অর্জিত দক্ষতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে অর্জিত বিশেষায়িত জ্ঞান অনুযায়ী কাজের সুযোগও পান না তারা।

প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু সেবাবিধিতে বিদেশে অধ্যয়নের সময়কে সক্রিয় চাকরিকাল হিসেবে গণ্য না করায় পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বিদেশফেরত শিক্ষকরা পিছিয়ে পড়েন। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি অনেকের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রেও পুনরায় খাপ খাইয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিদেশে বেড়ে ওঠা সন্তানদের বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক পরিবেশে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। নারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা, পদোন্নতিতে অদৃশ্য বাধা এবং সামাজিক প্রত্যাশার চাপ আরও বেশি অনুভূত হয়। গবেষণাটি ইঙ্গিত করে, দেশে ফিরে আসা মেধাবীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’-এর সম্ভাব্য সুফলও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

মেধা হারানোর প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেইন ড্রেইন-এর প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয় সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়ে। মেধাবীরা চলে গেলে চিন্তাশীল নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়, যোগ্যতার বদলে অনুগত ও অদক্ষ লোকজন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও মানসিকতাকে দুর্বল করে দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুল হাসান বলেন, ব্রেইন ড্রেনের কারণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে মানবসম্পদ বা হিউম্যান ক্যাপিটাল লস। সরকারের অর্থে ও সমাজের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই মেধাবীরা বিদেশে চলে যাওয়ায় দেশের গবেষণা, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না। এর ফলে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনীতিতে যে ‘স্পিলওভার ইফেক্ট’ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা অনেকাংশে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু একটি দিক থেকে নয়, একাধিক স্তরে ক্ষতি তৈরি করছে। প্রথমত, সরকার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে যে বিনিয়োগ করছে, তার প্রত্যাশিত রিটার্ন দেশে ফিরে আসছে না। দ্বিতীয়ত, উচ্চ আয়ের পেশাজীবী হিসেবে যাদের দেশে থাকার কথা ছিল, তারা বিদেশে চলে যাওয়ায় সম্ভাব্য কর, রাজস্ব বা ফিসকাল আয়ও হারাচ্ছে রাষ্ট্র। তবে তার মতে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো দীর্ঘমেয়াদি যেখানে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, মেধাবীরা দেশের বাইরে গেলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় না, বরং একটি গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক শূন্যতা তৈরি হয়। মেধাবীরা সমাজের চিন্তাশীল ও পেশাগত কাঠামো গড়ে তোলে। তারা চলে গেলে সেই কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে সমাজে চাটুকারিতা ও অদক্ষতার প্রবণতা বাড়ে এবং যোগ্যতার পরিবর্তে অনুগত ও অদক্ষ লোকজন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় মানসিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে।

কোন পথে সম্ভব রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অর্থনৈতিক প্রণোদনা নয় জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা, শিক্ষা ও পেশাগত সুযোগ মিলিয়ে একটি সামগ্রিক অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা গেলে তবেই রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন কার্যকর হতে পারে।

সমাধানের বিষয়ে মাহমুদুল হাসান বলেন, শুধু আহ্বান বা আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, প্রয়োজন একটি বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই নীতিমালা। তার মতে, দেশে উচ্চমানের গবেষণা ও চাকরির সুযোগ তৈরি করতে হবে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য পৃথক ও আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো চালু করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষক ও পেশাজীবীদের দেশের গবেষণা, নীতি প্রণয়ন ও প্রযুক্তি উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্ত করার জন্য কাঠামোগত ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনাও বাড়ানো সম্ভব।

অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘মেধাবীদের শুধু দেশে ফেরার আহ্বান জানালেই হবে না, তাদের জন্য কার্যকর সুযোগ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই ব্রেইন ড্রেন কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’

সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু আহ্বান বা বক্তব্য দিয়ে মেধাবীদের দেশে ফেরানো সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি। নির্দিষ্ট সংখ্যক বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে লক্ষ্য করে প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের জন্য উপযুক্ত বেতন, গবেষণা সুবিধা এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশে থাকা বিশেষজ্ঞদের জন্য শুধু চাকরির সুযোগ নয়, বরং তাদের জীবনমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা ও বয়ঃসীমার মতো বাধাও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তার মতে, সরকারের উদ্যোগগুলো এখনো মূলত ঘোষণাভিত্তিক, কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামো ও কার্যকর প্রোগ্রামের ঘাটতি রয়েছে। যদি বিদেশে থাকা মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য নির্দিষ্ট প্রকল্প, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে শুধু আহ্বান দিয়ে ফল পাওয়া যাবে না। উন্নত দেশগুলো যেমন বিদেশি মেধা আকর্ষণের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেয়, বাংলাদেশকেও একইভাবে একটি টেকসই কৌশল গ্রহণ করতে হবে। মেধাবীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকলে এবং উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন কার্যকর হয় না। 

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম আর কবির মনে করেন, বাংলাদেশে রিভার্স ব্রেইন ড্রেইনের প্রধান বাধা হলো: উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মানগত সীমাবদ্ধতা। তার মতে, শিক্ষার্থীরা কেন বিদেশে যাচ্ছে, তার কারণগুলো আগে চিহ্নিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘যদি দেশে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকত, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী বিদেশমুখী হতো না। গত তিন দশকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান সমানভাবে উন্নত হয়নি। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছেছে, কিছু মাঝামাঝি অবস্থানে আছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের মান এখনও প্রশ্নবিদ্ধ। সামগ্রিকভাবে উচ্চশিক্ষার মান উন্নত করা গেলে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমবে।’

রিভার্স ব্রেইন ড্রেইনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ড. কবির বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি পেশাজীবীদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। তারা যে সুযোগ-সুবিধা বিদেশে পাচ্ছেন, তার সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ও প্রণোদনা দেশে তৈরি করতে পারলে তাদের একটি অংশকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ভারত ও চীনের মতো দেশগুলোও এমন কৌশল গ্রহণ করে সুফল পেয়েছে।

বিদেশে থাকা দক্ষ বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে আমরা অনেক সময় বিদেশে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের উচ্চ পারিশ্রমিকে নিয়ে আসি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য আরও লাভজনক হবে, যদি আমরা এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারি, যেখানে তারা স্থায়ীভাবে দেশে কাজ করতে আগ্রহী হন।

তবে শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করে তিনি বলেন, মানুষ কোথায় থাকবে, সেই সিদ্ধান্তে জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা, সন্তানের শিক্ষা, পেশাগত বিকাশের সুযোগ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দক্ষ জনশক্তিকে দেশে ফেরাতে হলে সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মপরিবেশ এবং জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।

নীতি বদলে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ভারত-চীনসহ বিভিন্ন দেশ
মেধাপাচার বা ব্রেইন ড্রেইন শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও আয়ারল্যান্ডও একসময় ব্যাপকভাবে দক্ষ জনশক্তি হারিয়েছে। তবে পরিকল্পিত নীতি, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে এসব দেশ পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে।

ভারত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ উন্নত করতে আইআইটিগুলোতে গবেষণা পার্ক গড়ে তুলেছে এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস স্থাপনের সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ফেলোশিপ, গবেষণা অনুদান এবং আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো চালু করেছে। উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ‘স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

চীনও বিদেশে অবস্থানরত গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের দেশে ফেরাতে বিশেষ ট্যালেন্ট প্রোগ্রাম চালু করেছে। গবেষণা অনুদান, আবাসন সুবিধা ও মর্যাদাপূর্ণ পদ প্রদানের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশটি নিজস্ব গবেষণা ও উদ্ভাবন সক্ষমতা শক্তিশালী করেছে।

সিঙ্গাপুর উচ্চমানের শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ এবং বৃত্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড অর্থনৈতিক সংস্কার, বহুজাতিক কোম্পানির বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উচ্চশিক্ষায় ফি মওকুফের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ ধরে রাখার পরিবেশ তৈরি করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এবং উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে মেধাপাচার কমিয়েছে।

ব্রেইন সার্কুলেশনে জোর দিচ্ছে সরকার
বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে সরকার ‘ব্রেইন ড্রেইন’ ধারণার পরিবর্তে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ বা ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’ নীতির ওপর জোর দিচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো বিদেশে গিয়ে উচ্চশিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের পর শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা যেন দেশে ফিরে এসে গবেষণা, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখেন।

গত ১১ মে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিদেশে যাওয়া তরুণদের ফিরে এসে দেশের সেবায় কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেছেন, ‘ব্রেইন ড্রেইন নয়’, ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ করতে হবে। আমাদের দেশের সন্তানরা বাইরে গিয়ে উচ্চ শিক্ষিত হবে এবং সেখান থেকে আবার দেশে ফিরে আসবে। এসে দেশ সেবায়, মানবতার সেবায় কাজ করবে। সেভাবেই আমাদের দেশের উন্নয়ন হবে।’

একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, আমরা চাই ‘ব্রেন ড্রেন’ বন্ধ করে এটিকে ‘ব্রেন সার্কুলেশনে’ রূপান্তর করতে। প্রবাসে থাকা দক্ষ গবেষক ও একাডেমিকদের জয়েন্ট রিসার্চ ও শর্ট কোর্সের মাধ্যমে দেশের গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।

সবশেষ গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আমরা ব্রেইন ড্রেইনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তরের জন্য কাজ করছি। বিদেশে বসবাসরত বৈশ্বিক জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকার গবেষণা ও উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেয়া এবং কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করবে। আমরা মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়ন, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে চাই।

তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ সময়ে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকাঠামোর সবচেয়ে সংকটাপন্ন খাতগুলোর একটি ছিল শিক্ষা। তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আজ আমরা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে ফিরে এসেছি, সেখানে অবশ্যই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা সৎ, যোগ্য, দক্ষ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।