বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে, বাড়ছে বিদেশগামী ছাত্রছাত্রী
সম্ভাবনা, পরিকল্পনা ও উচ্চাশার দীর্ঘ খতিয়ান থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে উল্টো পথে হাঁটছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত। একদিকে প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশমুখী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা যেমন কমছে, তেমনি দেশের উচ্চশিক্ষার মান, গবেষণা পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষা গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মতে, শুধু পরিকল্পনা নয়, গবেষণা সংস্কৃতি, অবকাঠামো, আন্তর্জাতিকীকরণ এবং শিক্ষার্থী সহায়ক ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া এ পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে পছন্দের উচ্চশিক্ষার গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দেশে শিক্ষার্থী ভিসা ও অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা এসেছে। কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাডি পারমিটে কোটা নির্ধারণ করেছে, আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের শর্ত কঠোর করেছে এবং পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিটের নিয়মেও পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়াও বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ভিসা যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে, তবুও উচ্চশিক্ষার জন্য দেশটির আকর্ষণ কমেনি।
একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কোনো দেশে পড়তে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকদের কাজ, গবেষণা সুবিধা, লাইব্রেরি, টিউশন ফি, ক্যাম্পাস পরিবেশ এবং যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খোঁজেন। এসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্য ও সহযোগিতা না পেলে তারা অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেন।— অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, ইউজিসি সদস্য
‘ওপেন ডোরস রিপোর্ট অন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনাল এক্সচেঞ্জ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১৫৬ জনে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গেছেন ৩১৪ জন। একই সময়ে কানাডায় গেছেন ১ হাজার ১৩৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।
কোথায় যাচ্ছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা
ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৮ হাজার ৫২৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছেন, যা ২০২২ সালের ৮ হাজার ৬৬৫ জনের তুলনায় কিছুটা কম। তবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে ৬ হাজার ৫৮৬ জন, কানাডায় ৫ হাজার ৮৩৫ জন, মালয়েশিয়ায় ৫ হাজার ৭১৪ জন এবং জার্মানিতে ৫ হাজার ৪৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গেছেন।
এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় ১ হাজার ২০২ জন, সৌদি আরবে ১ হাজার ১৯০ জন, ফিনল্যান্ডে ৯৫৪ জন, তুরস্কে ৭৫১ জন, সুইডেনে ৬৬০ জন এবং কাতারে ৩০৮ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমিয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়েছিলেন ৪৯ হাজার ১৫১ জন শিক্ষার্থী, আর ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন। সবচেয়ে কম সংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গিয়েছেন গ্রিস, ব্রাজিল, জর্ডান, রোমানিয়া ও আর্মেনিয়ায়।
মহামারির পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে গন্তব্য নির্বাচনে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোতেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ধারাবাহিক উত্থান
ওপেন ডোরস রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ১৫৬ জন। এর আগে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ছিল ১৭ হাজার ৯৯ জন, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ১৩ হাজার ৫৬৩ জন, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ১০ হাজার ৫৯৭ জন এবং ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ৮ হাজার ৫৯৮ জন। আরও আগে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ৮ হাজার ৮৩৮ জন, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ৮ হাজার ২৪৯ জন এবং ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ৭ হাজার ৪৯৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়ন করছিলেন।
যুক্তরাজ্যে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি
যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম তিন কোয়ার্টারে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) মোট ৯ হাজার ৭০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী স্টুডেন্ট ভিসা পেয়েছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৪৩৪ জন এবং ২০২৩ সালে ৮ হাজার ৮৯৮ জন। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে এই সংখ্যা কমে ১ হাজার ৪৩ জনে নেমে এলেও ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২৭ জনে এবং ২০২২ সালে ৭ হাজার ৬১৫ জনে।
কানাডায় বড় ধাক্কা
স্টুডেন্ট ভিসায় আন্তর্জাতিক কোটা নির্ধারণের পর কানাডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রেকর্ড ৯ হাজার ৪৭৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কানাডায় গেলেও ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫০৫ জনে। ২০২৫ সালে আরও কমে হয় ৫ হাজার ৫৫০ জন। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে মাত্র ১ হাজার ১৩৫ জন শিক্ষার্থী ভিসা পেয়েছেন।
অথচ ২০২২ সালে ৭ হাজার ৩৫৫ জন এবং ২০২১ সালে ৬ হাজার ৫৮০ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডা বেছে নিয়েছিলেন। এর আগে ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৯০০ জন, ২০১৮ সালে ৪ হাজার ১৫০ জন এবং ২০১৭ সালে ২ হাজার ৮২৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দেশটিতে গিয়েছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ায় রেকর্ড প্রবৃদ্ধির পর শ্লথগতি
২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে উচ্চশিক্ষার জন্য মোট ৪০ হাজার ৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন। করোনা মহামারির দুই বছর ২০২০ ও ২০২১ সালে শিক্ষার্থী সংখ্যা যথাক্রমে ০.৯ শতাংশ ও ৯.৬ শতাংশ কমেছিল। তবে এরপর ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৫৮৪ জন এবং ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৭১৯ জন শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১০ হাজার ৩৫২ জনে পৌঁছে।
জাপান, মালয়েশিয়া ও ফিনল্যান্ডে নতুন আগ্রহ
জাপানে ২০২৪ সালে রেকর্ড ৭ হাজার ৫৯৭ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গেছেন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৩২৬ জন এবং ২০২২ সালে ৩ হাজার ৩১৩ জন। ২০২১ সালে ৩ হাজার ৯৫ জন এবং ২০২০ সালে ৩ হাজার ৯৮ জন শিক্ষার্থী জাপানে পড়তে যান। ২০১৯ সালে ছিল ৩ হাজার ৫২৭ জন, ২০১৮ সালে ৩ হাজার ৬৪০ জন এবং ২০১৭ সালে ২ হাজার ৭৪৮ জন।
মালয়েশিয়ায় ২০২৫ সালে গেছেন রেকর্ড ৪ হাজার ৭১৭ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৮৫ জন এবং ২০২৩ সালে ২ হাজার ৩৯৭ জন। করোনা মহামারির সময় ২০২১ সালে তা কমে ৯৩২ জনে নেমে এলেও পরে দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়। ২০২২ সালে ১ হাজার ৪৬৩ জন, ২০২০ সালে ১ হাজার ৪১৪ জন, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪৯২ জন, ২০১৮ সালে ৯০৬ জন এবং ২০১৭ সালে ১ হাজার ৮৩৪ জন শিক্ষার্থী দেশটিতে গিয়েছিলেন।
ফিনল্যান্ডও কোভিড-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালে দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন প্রায় ১ হাজার ২০০ জন। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০০ জনে। ২০২৪ সালে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন এবং ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ২ হাজার ২০০ ছাড়িয়ে যায়।
পতনের বৃত্তে বিদেশি শিক্ষার্থী
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০১৮ সালের পর থেকে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিম্নমুখী। ২০১৮ সালে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন ৮০৪ জন, ২০১৯ সালে ৪৮২ জন, ২০২০ সালে ৭৬৭ জন, ২০২১ সালে ৬৭৭ জন এবং ২০২২ সালে ৬৭০ জন। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা আরও কমে দাঁড়ায় ৬৩৩ জনে। দেশের ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ২১টিতে বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত ছিলেন। এর মধ্যে ৪৬২ জন ছাত্র এবং ১৭১ জন ছাত্রী।
বর্তমানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন ১১২ জন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯১ জন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৭ জন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৬ জন বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন।
এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ জন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ জন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬ জন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৬ জন, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ জন, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ জন, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ জন, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ জন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ জন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ জন, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ জন, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ জন, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ জন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে ১৫ জন এবং খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও নিম্নমুখী প্রবণতা
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও সেখানেও পতন শুরু হয়েছে। ২০২৩ সালে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩২টিতে বিদেশি শিক্ষার্থী ছিলেন ৮২৬ জন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৮৭ জন এবং ২০২১ সালে ছিল ১ হাজার ৬০৪ জন।
বেসরকারি মেডিকেলে ৬০ শতাংশ আসন ফাঁকা
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মেডিকেল কলেজে ৯৪ জন এবং বেসরকারি মেডিকেলে ২ হাজার ৩১৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মেডিকেলে ১০৩ জন এবং বেসরকারি মেডিকেলে ১ হাজার ৬৪০ জন ভর্তি হন। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মেডিকেলে ৯৬ জন এবং বেসরকারি মেডিকেলে ১ হাজার ২১ জন ভর্তি হন। সবশেষ ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মেডিকেলে ১০৪ জন এবং বেসরকারি মেডিকেলে ১ হাজার ৯৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন।
দেশে বর্তমানে ৬৭টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট আসন সংখ্যা ৬ হাজার ২৯৩। এর মধ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার ৭৬৪টি আসন। অথচ চলতি বছর প্রায় ৬০ শতাংশ আসন ফাঁকা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশন (ডব্লিউএফএমই)-এর অনুমোদন না পেলে অনেক দেশে বাংলাদেশের এমবিবিএস ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির ওপরও পড়েছে। একসময় যেখানে আড়াই থেকে তিন হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে আসতেন, এখন সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারত থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাকি মো. জাকিউল আলম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ভারতের কাশ্মীর অঞ্চল থেকে আসে। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে সেখান থেকে শিক্ষার্থী আসা কমে গেছে।
সরকার চায় ‘এডুকেশন হাব’ হতে
বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমলেও বাংলাদেশকে বৈশ্বিক মানচিত্রে একটি শীর্ষস্থানীয় উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র বা ‘এডুকেশন হাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের কথা বলছেন নীতিনির্ধারকরা।
গত ৬ মে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক ও উপাচার্যদের এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সেরা শিক্ষা হাবে পরিণত হওয়ার সব ধরনের সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা এডুকেশন হাব। আমাদের সেই রিসোর্স রয়েছে, আমাদের সেই মেধা রয়েছে, আমাদের সেই প্রোগ্রাম রয়েছে, আমাদের সেই ইচ্ছা রয়েছে। এটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।’
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ একসময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করত এবং ভবিষ্যতেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। বিদেশে শিক্ষাগ্রহণ শেষে দেশে ফিরে অবদান রাখার প্রবণতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ আকৃষ্ট করার বিষয়েও সরকার কাজ করছে।
এরপর ৯ মে এক আলোচনা সভায় ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বের শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় উচ্চশিক্ষার গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে ইউজিসি কাজ করছে। এমন একটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি শিক্ষার্থীরাও পড়াশোনার সুযোগ পাবে।
কেন কমছে বিদেশি শিক্ষার্থী
শিক্ষাবিদদের মতে, বিদেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। আবাসন সংকট, সীমিত বৃত্তি, নিরাপত্তা উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন, গবেষণার সীমিত সুযোগ এবং প্রশাসনিক জটিলতা অন্যতম কারণ।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মনিরা জাহান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা কোনো দেশে পড়তে যাওয়ার আগে বৃত্তি, টিউশন ফি, আর্থিক সহায়তা, আবাসন সুবিধা এবং শিক্ষার্থী হিসেবে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন, সেসব বিষয় বিবেচনা করেন। বাংলাদেশে এসব সুবিধা কতটা প্রতিযোগিতামূলক, সেটিও তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
তিনি বলেন, নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে থাকতে পারে। ফলে তারা অন্য গন্তব্য বেছে নিতে আগ্রহী হতে পারেন।
দেশের উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং দক্ষ তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব অনেককে বিদেশমুখী করছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজের শিক্ষাব্যয় বহনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও পাচ্ছেন। এছাড়া বর্তমান প্রজন্ম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অবগত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা বিদেশে অধ্যয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে পারছেন, যা বিদেশে যাওয়ার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।—অধ্যাপক ড. মনিরা জাহান, সাবেক পরিচালক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষার মান ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে যখন বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে বা শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে নেতিবাচক আলোচনা হয়, তখন বিদেশি শিক্ষার্থীরাও সেটি বিবেচনায় নেন। তারা দেখতে চান, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কতটা স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য হবে।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ অনেক বিস্তৃত হয়েছে। বিভিন্ন দেশ বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা ও বৃত্তি দিচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের সামনে আগের তুলনায় অনেক বেশি বিকল্প তৈরি হয়েছে এবং তারা তুলনামূলক ভালো সুযোগের দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সরকারের শিক্ষা হাব গড়ার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গবেষণার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত গবেষণা অবকাঠামো, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক ল্যাবরেটরি, গবেষণা অনুদান এবং সক্রিয় গবেষণা সংস্কৃতি ছাড়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়।
ইউজিসি সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কোনো দেশে পড়তে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকদের কাজ, গবেষণা সুবিধা, লাইব্রেরি, টিউশন ফি, ক্যাম্পাস পরিবেশ এবং যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য খোঁজেন। এসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্য ও সহযোগিতা না পেলে তারা অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেন।
তিনি বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে হলে আন্তর্জাতিক মানের তথ্যসমৃদ্ধ ও ব্যবহারবান্ধব ওয়েবসাইট, গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা সহকারী ও শিক্ষক-সহকারী কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থী সহায়ক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, বর্তমানে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন এজেন্সির ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরাসরি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সুশাসন, গবেষণা সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী-বান্ধব নীতিমালা জোরদার করতে হবে।
তিনি জানান, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও প্রস্তুত ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলতে ইউজিসি বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করা, গবেষণা পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থী সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার বিষয়ে কাজ চলছে। একই সঙ্গে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও সেবা কার্যক্রম কীভাবে আরও সহজ ও সমন্বিত করা যায়, সে বিষয়েও কমিশন কাজ করছে।
তার মতে, সরকার উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও আন্তর্জাতিকমুখী করা গেলে বাংলাদেশ আবারও বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় উচ্চশিক্ষা গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
কেনো বদলে গেল বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের পছন্দের গন্তব্য?
বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, দেশ ছাড়ার পেছনে কাজ করছে দেশের ভঙ্গুর কর্মসংস্থান, যুগোপযোগী শিক্ষার অভাব, ক্যারিয়ারের দীর্ঘসূত্রতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের চরম অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তরুণরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখলেও, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে দৃশ্যমান কোনো সংস্কার না আসায় হতাশা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশগুলোর ভিসানীতিতে কঠোরতা আসায় ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছেন শিক্ষার্থীর।
ফিনল্যান্ডের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ জানান, তিনি উচ্চশিক্ষা শেষে ইউরোপেই স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। দেশের শিক্ষা ও চাকরিবাজারের তুলনা টেনে তিনি বলেন, ‘এখানে শিক্ষার পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার মান চমৎকার। বাংলাদেশে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করে একজন শিক্ষার্থীকে মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিতে ঢুকতে হয়; যা দিয়ে বর্তমান বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। অথচ বিদেশে পড়াশোনা শেষে শুরুতে ন্যূনতম ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব, যা জীবনযাত্রার মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সংস্কারের ধীরগতির কারণে তরুণ প্রজন্ম এখন দেশ ছাড়াকেই একমাত্র সমাধান ভাবছে।’
মালোয়েশিয়া ইউনিভার্সিটি মালায়া (ইউএম) স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত সাদিয়া আফসানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মূলত স্নাতক সম্পন্ন করার পর আমার লক্ষ্য ছিলো কানাডার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সেখানে সম্প্রতি ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে যাওয়ায় মালোয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছি। এখানে কম খরচে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও মুসলিম-ফ্রেন্ডলি পরিবেশ ও হালাল খাবারের সুবিধা রয়েছে। এছাড়া নিরাপদ ও শান্ত জীবনযাত্রার জন্যও মালোয়েশিয়া একটি ভালো দেশ।
ঢাকাভিত্তিক একটি শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক কাজী হামিদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারি শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ঘরে বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে বিদেশে পড়াশোনা, নতুন পরিবেশে বসবাস এবং বৈশ্বিক সুযোগ-সুবিধা অনুসন্ধানের আগ্রহ বাড়িয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে তুলনামূলক কম সময়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার সুযোগও শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করছে। আর্থিকভাবে সক্ষম শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। অন্যদিকে তুলনামূলক কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এছাড়া সরকারি ও আন্তর্জাতিক বৃত্তির সুযোগও বিদেশমুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মূলত স্নাতক সম্পন্ন করার পর আমার লক্ষ্য ছিলো কানাডার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সেখানে সম্প্রতি ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে যাওয়ায় মালোয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছি। এখানে কম খরচে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও মুসলিম-ফ্রেন্ডলি পরিবেশ ও হালাল খাবারের সুবিধা রয়েছে। এছাড়া নিরাপদ ও শান্ত জীবনযাত্রার জন্যও মালোয়েশিয়া একটি ভালো দেশ।—সাদিয়া আফসানা, শিক্ষার্থী, মালোয়েশিয়া ইউনিভার্সিটি মালায়া
যদিও শিক্ষাবিদদের মতে, বিদেশমুখী হওয়ার পেছনে শুধু উন্নত শিক্ষার আকর্ষণ নয়, দেশের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মনিরা জাহান মনে করেন, ব্রেইন ড্রেইনের গন্তব্য বদলে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং দক্ষ তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব অনেককে বিদেশমুখী করছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজের শিক্ষাব্যয় বহনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও পাচ্ছেন। এছাড়া বর্তমান প্রজন্ম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অবগত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা বিদেশে অধ্যয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে পারছেন, যা বিদেশে যাওয়ার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক পরিবার উন্নত জীবনমান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তরুণদের বিকল্প পরিকল্পনার গুরুত্ব বুঝিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজেদের জন্য আরও বিস্তৃত সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষাকে বেছে নিচ্ছেন।