২৯ মে ২০২৬, ২০:০৪

সাত কলেজকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর, বুয়েটসহ আরও ১০ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাও ছিল একইরকম

১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো  © টিডিসি সম্পাদিত

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৮টি। এরমধ্যে স্বায়ত্তশাসিত (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর), প্রকৌশল, সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মেডিকেল, কৃষি এবং বিশেষায়িত—এ সাত ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে রাজধানী ঢাকার সাতটি বড় সরকারি কলেজের জন্য ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির’ নামে নতুন একটি পাবলিক (সাধারণ) বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এসে গত ১০ এপ্রিল ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস করেছে।

দেশের ৫৭তম এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরের সাতটি কলেজে (ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ) ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ‘সংযুক্ত কলেজ’ হিসেবে থাকবে এবং কলেজগুলোর পরিচয়, বৈশিষ্ট্য, অবকাঠামো ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও অন্যান্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকবে।

কাগজপত্রে ভাষায় ভিন্নতা থাকলেও নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম অনেকটা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই হবে। এখন ঢাকার সাতটি কলেজ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে ‘সংযুক্ত’ কলেজ হিসেবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ২০১৭ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং তার আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অধিভুক্ত’ কলেজ হিসেবে চলেছে এসব কলেজ।

শুধু ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির’ নয়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত  আরও ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা হয়েছে কলেজ কিংবা ইনস্টিটিউট থেকে। তবে আগেরগুলো একটি কলেজ বা ইনস্টিটিউট থেকে আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় হলেও সাত কলেজ নিয়ে প্রথম হলো একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

আগের ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় হলো-বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স), পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু) এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

আহসানউল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে বুয়েট
কারিগরি শিক্ষা প্রসারের জন্য ১৮৭৬ সালে ঢাকা সার্ভে স্কুল নামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে সেটিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত আহসানউল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পরিণত করা হয়। ১৯৬২ সালে এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চতুর্থ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পরে এর নাম হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

বিআইটি ভেঙে চার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি) ছিল বাংলাদেশের একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯৮৬ সালের ১ জুলাই  ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউটস অব টেকনোলজি (বিআইটি) অধ্যাদেশ, ১৯৮৬’ (অধ্যাদেশ নং: XXI, ১৯৮৬) এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এটি ছিল দেশের অষ্টম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এটি বাংলাদেশের চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এটি ছিল বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত কারিগরি শিক্ষা-সম্পর্কিত বিশ্ববিদ্যালয়। বিআইটির শাখাগুলো ছিল: বিআইটি, চট্টগ্রাম, বিআইটি, রাজশাহী, বিআইটি, খুলনা এবং গাজীপুরের বিআইটি, ঢাকা। 

বিআইটি অধ্যাদেশের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার ২০০৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে পৃথক চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তর করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে আইন পাশের মাধ্যমে ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১ সেপ্টেম্বরও ২০০৩ সালে এটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে বর্তমান চুয়েট নাম ধারণ করে।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ১৯৬৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রকৌশল অনুষদের অধীনে খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১ সেপ্টেম্বর ২০০৩ সালে বিআইটি থেকে উন্নীত করে এবং নাম পরিবর্তিত করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রাখা হয়।

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট) ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদ হিসেবে ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নামকরণ করা হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ঢাকা। এরপর ডুয়েট নামে যাত্রা করে প্রতিষ্ঠানটি।

বিএআই থেকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হকের উদ্যোগে বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট (বিএআই) প্রতিষ্ঠিত হয় ১১ ডিসেম্বর ১৯৩৮ সালে। ১৯৪৭ সালে নাম পরিবর্তিত হয়ে ইস্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট এবং ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট হয়। 

১৯৩৮ সাল থেকে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদ হিসেবে পরিচালিত হয় এবং ১৯৬৪ সালে এর একাডেমিক কার্যক্রম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হয়। অবশেষে ২০০১ সালে এটি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।

সিভাসু কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু) বাংলাদেশের একটি বিশেষায়িত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯৫ সালের ২৮ নভেম্বর এটি চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ৭ আগস্ট ২০০৬ সালে এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করা হয়। এটি দেশের একমাত্র ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়।

ব্রিটিশ স্কুল অব উইভিং থেকে বুটেক্স
১৯২১ সালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশ স্কুল অব উইভিং নামে ঢাকার নারিন্দায় এই প্রতিষ্ঠানটি চালু হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূর্ব বাংলা টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট। ১৯৫০ সালে এই প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট৷ এর কিছুকাল পর ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের বর্তমান ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা হয়৷

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরবর্তী সময়ে ১৯৭৮ সালে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারের পক্ষ থেকে কলেজে (মহাবিদ্যালয়) রূপান্তর করা হয়; নতুন করে নামকরণ করা হয় বস্ত্রকৌশল ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়।

বাংলাদেশের চলমান অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের গুরুত্ব বিবেচনা করে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের উদ্যোগে ২০১০ সালে বস্ত্রকৌশল শিক্ষার এই প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার প্রস্তাব করা হলে বিলটি জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের মাধ্যমে ২০১০ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় বিল চূড়ান্তভাবে পাস হয়, যা ২২ ডিসেম্বর, ২০১০ থেকে কার্যকর হয়। 

বেসরকারি কৃষি কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়
পটুয়াখালী জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় পটুয়াখালী কৃষি কলেজ; যা ১৯৭৯-৮০ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের অধিভুক্ত হয়ে বেসরকারি কৃষি কলেজ হিসেবে স্নাতক পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করে। ২০০০ সালের ৮ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কৃষি কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উদ্বোধন করেন। ২০০১ সালের ১২ জুলাই জাতীয় সংসদে পটুয়াখালী কৃষি কলেজ বিলুপ্ত করে ‘পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ আইন পাস হয় এবং ২০০২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ রূপ লাভ করে।

ব্রাহ্ম স্কুল থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বনাম জগন্নাথ কলেজ। এই নামেই বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জুড়ে পরিচিত ছিল। ১৮৫৮ সালে দীননাথ সেন, প্রভাতীচরণ রায়, অনাথবন্ধু মল্লিক এবং ব্রজসুন্দর কৈত্র ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল নামে এর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৭২ সালে এর নাম বদলে জগন্নাথ স্কুল করা হয়। মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী তার বাবার নামে জগন্নাথ স্কুল নামকরণ করেন।

১৮৮৪ সালে এটি একটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজে ও ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজে পরিণত হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুরু হলে জগন্নাথ কলেজের স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে ১৯৪৯ সালে আবার এ কলেজে স্নাতক পাঠ্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র আন্দোলনকে দমন করতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রি শাখাকে মহাখালীতে স্থানান্তর করে জিন্নাহ কলেজ (বর্তমান তিতুমীর কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৮ সালে এটিকে সরকারীকরণ করা হয়, কিন্তু পরের বছরেই আবার এটি বেসরকারী মর্যাদা লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা হয়। পরবর্তীতে ২০০৫ সালের ২০ অক্টোবর জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৫ পাশের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়।