২৯ মে ২০২৬, ১৬:৩৬

নর্থ সাউথ-ব্র্যাককে তো আমি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ই মনে করি না: ঢাবি অধ্যাপক

ঢাবি অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন  © ফাইল ছবি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের দেওয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির সিনেট সদস্য ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের পার্সপেক্টিভে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এখনো যেকোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক অনেক অনেক উপরে। নর্থ সাউথ ও ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়কে তো আমি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ই মনে করি না। আজ শুক্রবার (২৯ মে) বিকেলে নিজের ফেসবুকের এক পোস্টে এ মন্তব্য করেন তিনি। 

ড. কামরুল হাসান মামুন লেখেন, ‘আমিতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলি কোচিং সেন্টার: ববি হাজ্জাজ’-এখানেই থামলে আমি অতটা আঁতকে উঠতাম না। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যে নিম্নগামী এই বিষয় নিয়ে আমি অনেকদিন ধরে বলে আসছি। তারপর তিনি বলেছেন যে, ‘নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার কানাকড়িও করে না’!  

‘‘উপরের এই কথাটি ভীষণ আপত্তিজনক। বাংলাদেশের শিক্ষা বিষয়ক একজন মন্ত্রী হয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের মান মাপার যোগ্যতা উনার নেই। এটা খুবই দুঃখজনক। উনি নর্থ সাউথে চাকুরি করেছেন। তাই নর্থ সাউথকেই বড় করে দেখেছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশটাকে বড় পর্দায় রেখে সততার সাথে মান বিচার করার জন্য যে উনি মারাত্মক লেভেলের অযোগ্য একজন মানুষ। তা তিনি এই কথার মাধ্যমেই প্রমাণ করেছেন।’’

তিনি লেখেন, বাংলাদেশের পার্সপেক্টিভে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা এখনো বাংলাদেশের যেকোনো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক অনেক অনেক উপরে। নর্থ সাউথ ও ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়কেতো আমি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ই মনে করি না। এইগুলো এখনো বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেনি তবে উন্নতি করছে। আরও দ্রুত উন্নতি করতো যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড নামক লোকজন মালিকের ভূমিকায় থেকে শিল্প কারখানার মত এখান থেকে অর্থবিত্ত চুষে না নিতেন। যারা এমন কাজ করে তারাতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হওয়ারই যোগ্য না। কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হতে পারাটাকে সৌভাগ্য মনে না করে বা এইটাকেই যারা বিশাল প্রাপ্তি ভাবতে না পারে তারা কীভাবে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হয়? 

ড. কামরুল হাসান মামুন লেখেন, আমি কেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এখনো বিশ্ববিদ্যালয় বলতে রাজি না এর কারণ হলো এগুলোতে এখনো ফান্ডামেন্টাল সাবজেক্ট তেমন নাই। এইখানে এখনো গবেষণার ইকো সিস্টেমই জন্ম নেয় নাই। শিক্ষকরা সারা বছর জুড়ে শিক্ষা কর্মীর মত কেবল ক্লাস নিতেই ব্যস্ত থাকেন। গবেষণা করার জন্য যেই সময় ও ছুটি দেওয়া দরকার এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি দেয়? এদের কি শক্তিশালী পিএইচডি প্রোগ্রাম আছে? এদের কি পোস্ট-ডক বলতে কিছু আছে? গবেষণা পত্রের সংখ্যা বিচারই সব না। কোথায় প্রকাশ করেছে সেটাও ম্যাটার। নেচার, নেচার কমিউনিকেশন, পদার্থবিজ্ঞানের APS বা এই জাতীয় পদার্থবিজ্ঞানকে সার্ভ করে এমন কমিউনিটি থেকে প্রকাশিত জার্নালে গবেষণা পত্র কয়টি প্রকাশিত হয়েছে? আমি নিশ্চিত প্রতিটি সাবজেক্টেরই এমন কিছু ফ্ল্যাগশিপ জার্নাল আছে। সেখানে কতটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে? তবে আমি পাবলিক প্রাইভেটে বিভাজনের পক্ষে নই। আমি চাই বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ই সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক। যেই দেশে যত ভালো মানের বিশ্ববিদ্যালয় থাকে সেই দেশটি তত ভালো মানের। দেশের উন্নয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের সাথে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যায়। 

তিনি আরও লেখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন ডুবন্ত জাহাজ এইটা মানতে রাজি। আর এই মন্ত্রীরা তথা আমাদের সরকারগুলোই এর জন্য দায়ী। যেমন প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন শিক্ষক নিয়োগে রাজনীতির কারণে র‍্যাংকিংয়ে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। আবার তিনিই সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একদম দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগ দিয়েছেন। আর আমরা জানি বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ আসলে এককভাবে ভিসিরাই করে। ভিসির নেতৃত্বে যে নিয়োগ বোর্ড হয় সেটা আসলে কেবলই নিয়ম রক্ষা করে মানুষকে বোকা বানানোর জন্য। তাহলে আপনি শিক্ষক নিয়োগের রাস্তাটিকে রাজনীতিকরণ করে শিক্ষক নিয়োগের রাজনীতিকরণের অভিযোগ আনবেন এইটাতো দ্বিচারিতার চরম উদাহরণ। 

‘‘এই জন্যই বলি বাংলাদেশে আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ই নাই। বিশ্ববিদ্যালয় হতে হলে সব কিছুর নিয়ম ইউনিভার্সাল হতে হয়। আমারতো সব নিয়মকে ইউনিভার্সাল না করে লোকাল করে ফেলেছি। আশা করব ববি হাজ্জাজ সাহেব কথা বলার আগে একটু হোম ওয়ার্ক করে নিবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিক্সের জন্মস্থান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনও অধ্যাপক আছেন যারা ওয়ার্ল্ড ক্লাস গবেষণা করেন। এই সংখ্যা কমে যাচ্ছে এইটা ঠিক। আর কোমর জন্য আপনারাই দায়ী। নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তো এখনো শুরুই হয়নি। তবে এইগুলো উন্নতির পথে। By the way, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকদের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স যেন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে?’’