‘প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা’ নামে নতুন অধিদপ্তর গঠন করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জানেন না মন্ত্রী
ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা’ নামে নতুন অধিদপ্তর গঠন করতে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি কমিটিও গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে খোদ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তাব্যক্তি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এ বিষয়ে অবগত নন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. আ ন ম বজলুর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। ‘দেশের সকল ইউনিয়নে এবং সিটি কর্পোরেশনে ওয়ার্ডভিত্তিক সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য রাজস্বখাতে সুস্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও পদ সৃজন সংক্রান্ত’ ওই সভায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
সভায় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) মো. খোরশেদ আলমকে সভাপতি ও উপসচিব (প্রশাসন-১ শাখা) ইমতিয়াজ হোসেনকে সদস্য সচিব করে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন— স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্মসচিব (প্রশাসন), স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্মসচিব (প্রশাসন), কমিউনিটি ক্লিনিক সহায়তা ট্রাস্টের একজন প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা)। কমিটিকে ২০ কর্মদিবসের মধ্যে কার্যক্রম সম্পন্ন করার কথা বলা হলেও এখনও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ওই সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, দেশের সকল ইউনিয়নে এবং সিটি কর্পোরেশনে ওয়ার্ডভিত্তিক ‘স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য রাজস্বখাতে স্বাস্থ্য কর্মীর পদ সৃজন, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং কোন অধিদপ্তরের মাধ্যমে হবে— এ বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনার জন্য সভাটি আয়োজন করা হয়।
যা নিয়ে কাজ করবে নতুন অধিদপ্তর
৬ অক্টোবরের সভায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে সর্বজনীন ও জনমুখী করে গড়ে তুলতে হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি বলেন, কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে পুনর্গঠন করে ‘Department Of Primary Health Care (DPHC)’ (প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তর) নামে নতুন অধিদপ্তর গঠন করা প্রয়োজন।
তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আরও অন্তত এক সপ্তাহ পর এ নিয়ে কিছু বলা যাবে— ইমতিয়াজ হোসেন, উপসচিব (প্রশাসন-১ শাখা), স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ও কমিটির সদস্য সচিব
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আরও জানান, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি), স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য সহকারী এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিবার পরিকল্পনা সহকারীসহ প্রয়োজনীয় জনবল এ অধিদপ্তরের সাথে একীভূত হবে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। এ অধিদপ্তরের আওতাধীন দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে সাড়ে তিন তলা বিশিষ্ট প্রাথমিক হেলথ কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে।
নতুন জনবল নিয়োগ ও বিদ্যমান জনবলকে একীভূতকরণ প্রসঙ্গে ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সকল ইউনিয়নে এবং সিটি কর্পোরেশনে সকল ওয়ার্ডভিত্তিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের জন্য রাজস্বখাতে স্বাস্থ্য কর্মীর আরও ১ লক্ষ জনবল সৃজন করতে হবে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য সহকারী, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের সিএইচসিপি এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিদ্যমান পরিবার কল্যাণ সহকারী ও পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক (এফপিআই) পদগুলোকে ‘স্বাস্থ্য কর্মী’ পদের সাথে পরবর্তীতে একীভূত করতে হবে। একীভূত করার ক্ষেত্রে কেউ যেন আর্থিক এবং প্রশাসনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে দিকে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে।
অধিদপ্তর গঠনে কাজ করছে কমিটি
সভায় নতুন অধিদপ্তর গঠনের জন্য এ বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করার প্রস্তাব দেন অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. খোরশেদ আলম। তিনি জানান, কমিটি নতুন অধিদপ্তরের রূপরেখা, জনবল কাঠামো প্রণয়ন, ক্যারিয়ার প্ল্যান, কার্যপরিধি নিয়ে প্রয়োজনীয় মতামত প্রদান করবে।
আলোচনা শেষে ‘Department Of Primary Health Care’ (প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তর) নামে নতুন একটি অধিদপ্তর পুনর্গঠন এবং এই নতুন অধিদপ্তরের রূপরেখা, জনবল কাঠামো প্রণয়ন, ক্যারিয়ার প্ল্যান, কার্যপরিধি নির্ধারণের উদ্দেশ্যে ৭ সদস্যের ওই কমিটি গঠন করা হয়। একই সাথে বর্ণিত কার্যক্রম ২০ কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে বলেও জানানো হয় কমিটিকে।
এ বিষয়ে জানতে নতুন অধিদপ্তরের রূপরেখা, জনবল কাঠামো প্রণয়ন, ক্যারিয়ার প্ল্যান, কার্যপরিধি নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সভাপতি ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খোরশেদ আলম এবং কমিটির সদস্য যুগ্মসচিব (প্রশাসন অধিশাখা) শাব্বির ইকবাল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।
কমিটির সদস্য সচিব ও উপসচিব (প্রশাসন-১ শাখা) ইমতিয়াজ হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। আরও অন্তত এক সপ্তাহ পর এ নিয়ে কিছু বলা যাবে।
জানেন না খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে ইউনিয়ন ও সিটি কর্পোরেশনে ওয়ার্ড পর্যায়ে হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং সেন্টার বা ‘সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ স্থাপনের উদ্যোগের কথা প্রথম এ বছরের ২৩ আগস্ট জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। ওই দিন নওগাঁ সদর হাসপাতাল পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় এই কথা জানিয়েছিলেন তিনি। মন্ত্রী বলেছিলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতি তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে একটি ‘হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং সেন্টার’ এবং প্রতি তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে একটি ‘হেলথ হাব’ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
কোনো অধিদপ্তর হবে না, আমি জানি না এই ব্যাপারে। উনাকে (প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী) জিজ্ঞেস করবেন, আমি জানি না— সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, স্বাস্থ্যমন্ত্রী
চিকিৎসাসেবাকে পাঁচস্তরে ভাগ করা হচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওই দিন বলেন, ওয়ার্ড পর্যায় থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে রোগীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত রিপোর্ট পাঠানো হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকবেন। কোনো রোগীর চিকিৎসা যদি ওই চিকিৎসকের সক্ষমতার বাইরে হয়, তাহলে তিনি রোগীকে উপজেলা পর্যায়ে রেফার করবেন। উপজেলা পর্যায়েও যদি চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে রোগীকে জেলা পর্যায়ে পাঠানো হবে। জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সম্ভব না হলে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে।
পরবর্তীতে ৩০ আগস্ট ‘হেলথ ওয়েলবিয়িং ওয়ার্কার’ বা ‘সুস্বাস্থ্য কর্মী’ নিয়োগের বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য সভা আহ্বান করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ওই সভায় ৪৫ হাজার ৭১১টি পদ সৃজনের বিষয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় তৎকালীন স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী সভাপতিত্ব করবেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ গুরুত্বপূর্ণ কতাব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন।
এরপর বিভিন্ন সময়ে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ‘সুস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ স্থাপন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালীকরণসহ এ সংক্রান্ত নানা বিষয়ে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এদিকে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তর’ গঠনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে রবিবার (৮ নভেম্বর) স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমরা তো নতুন অধিদপ্তর করতে চাচ্ছি না। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিচে গ্রাম লেভেলে আমরা ওইটাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নামে করব। নতুন অধিদপ্তর হচ্ছে না। সবাইকে একটা নামে নিয়ে আসব।’
গত ৬ অক্টোবর স্বাস্থ্য সচিবের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীর উপস্থিতিতে কমিটি গঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো অধিদপ্তর হবে না, আমি জানি না এই ব্যাপারে। উনাকে জিজ্ঞেস করবেন, আমি জানি না।’
এ বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এসএম জিয়াউদ্দীন হায়দার ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব ড. আ ন ম বজলুর রশিদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তারা কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।