ত্বকের সাধারণ রোগ ভেবে ভুল করছেন? সোরিয়াসিস বাড়াতে পারে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি
অনেকসময় আমরা হঠাৎ ত্বকে লালচে দাগ দেখতে পায়। তবে অনেকে এটিকে স্বাভাবিক আবার অনেকে সাধারণ এলার্জির সমস্যা ভেবে তেমন গুরুত্ব দেন না। কিছু কিছু সময় শুধু তাবক লালচেই নয় পুরু আবরণ ও আঁশের মতো খোসা ওঠে। এটি মূলত সাধারণ কোনো এলার্জি না, এটি সোরিয়াসিসের পরিচিত লক্ষণ। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা ত্বকের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অঙ্গ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতীয় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রিঙ্কি কাপুরের মতে এ রোগের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এমনকি হৃদরোগ ও বিপাকীয় সমস্যারও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই শুধু ত্বকের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ নয়, রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি
সোরিয়াসিস কেন হয়
সোরিয়াসিস মূলত রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার অস্বাভাবিক সক্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এ অবস্থায় ত্বকের কোষ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক দ্রুত তৈরি হতে থাকে। ফলে ত্বকের ওপর অতিরিক্ত কোষ জমে পুরু, লালচে ও আঁশযুক্ত দাগের সৃষ্টি করে। সাধারণত কনুই, হাঁটু, মাথার ত্বক ও কোমরের নিচের অংশে এ রোগের লক্ষণ বেশি দেখা যায়। তবে শরীরের অন্য অংশেও এটি হতে পারে।
ত্বকের বাইরেও যেসব ঝুঁকি তৈরি করে
সোরিয়াসিসের প্রভাব শুধু ত্বকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস, হৃদরোগ এবং বিপাকীয় বিভিন্ন জটিলতার যোগসূত্র রয়েছে। সোরিয়াটিক আর্থ্রাইটিস হলে জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা ও শক্ত ভাব দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, ত্বকের দৃশ্যমান দাগের কারণে অনেক রোগী সামাজিক অস্বস্তি ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন, যা তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়।
এছাড়া মানসিক চাপ বাড়াতেও এ রোগের ভূমিকা রয়েছে। সবার ক্ষেত্রে মানসিক চাপের কারণে সোরিয়াসিস না বাড়লেও, অনেকের অতিরিক্ত চাপের সময়ে রোগের উপসর্গ তীব্র হতে দেখা যায়। আবার ত্বকের অস্বস্তি ও দৃশ্যমান দাগ থেকে তৈরি মানসিক চাপ রোগের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
একজিমা সংক্রমণ ভেবে ভুল করা যাবে না
সোরিয়াসিসের লক্ষণ অনেক সময় একজিমা বা ছত্রাকজনিত সংক্রমণের সঙ্গে মিলে যায়, ফলে রোগ শনাক্তকরণে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ত্বকে দীর্ঘদিন ধরে দাগ থাকা, বারবার একই সমস্যা ফিরে আসা কিংবা অজানা কারণে ত্বকের পরিবর্তন দেখা দিলে নিজে নিজে ওষুধ ব্যবহার না করে দ্রুত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়
সোরিয়াসিসের চিকিৎসা সম্পূর্ণ নির্ভর করে রোগের তীব্রতা ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর। অল্প সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শে ত্বকে ব্যবহারের জন্য কর্টিকোস্টেরয়েড বা ভিটামিন ডি-জাতীয় ওষুধ দেওয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ফটোথেরাপি বা বিশেষ আলোক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। রোগের মাত্রা বেশি হলে শরীরের ভেতরে কাজ করে এমন ওষুধ বা আধুনিক বায়োলজিক্যাল থেরাপি ব্যবহার করা হয়, যা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার প্রদাহ সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।
যে-সব অভ্যাস পরিবর্তন জরুরি
নিয়মিত ত্বক পরিষ্কার রাখা এবং ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার,পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা ও সুষম খাবার খাওয়া,মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া এবং ত্বকে আঘাত লাগলে বা অতিরিক্ত মানসিক চাপের সময় উপসর্গ বাড়তে পারে, তাই নিজের ক্ষেত্রে ট্রিগার পয়েন্টগুলো শনাক্ত করে সেগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা।
সোরিয়াসিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়
সোরিয়াসিস নিয়ে সমাজে বহু ভুল ধারণা রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি হলো এটি ছোঁয়াচে রোগ। বাস্তবে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে, একসঙ্গে বসবাস করলে বা একই জিনিস ব্যবহার করলে এ রোগ ছড়ায় না। এটি কোনো ধরনের অপরিচ্ছন্নতার কারণেও হয় না। তাই এ বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি, যাতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোনো ধরনের অবহেলা বা বৈষম্যের শিকার না হন।