০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৬

ডায়াবেটিস নিয়ে প্রচলিত ৬ ভুল ধারণা

ডায়াবেটিস   © সংগৃহীত

ডায়াবেটিস নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে নানা ভুল ধারণা। কেউ মনে করেন, শুধু মিষ্টি খেলেই এ রোগ হয়, আবার কেউ ভাবেন রোগা মানুষের ডায়াবেটিস হতে পারে না। অনেকে ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার পর ভাত ও ফল খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। আবার কারও ধারণা, ইনসুলিন নিলে কিডনি নষ্ট হয় কিংবা ভেষজ ওষুধে ডায়াবেটিস স্থায়ীভাবে সেরে যায়। এসব ধারণার বেশির ভাগই ভুল। চিকিৎসকদের মতে, এমন ভ্রান্ত ধারণার কারণে অনেকে সময়মতো পরীক্ষা করান না, চিকিৎসা নিতে দেরি করেন কিংবা প্রয়োজনীয় ওষুধ বন্ধ করে দেন।

ডায়াবেটিস বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে প্রথমেই এ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করা জরুরি। ডায়াবেটিস নিয়ে এমন ছয়টি প্রচলিত ভুল ধারণা ও সেগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম।

প্রথম ভুল ধারণা হলো, রোগা মানুষের ডায়াবেটিস হয় না। এ ধারণা সঠিক নয়। স্থূলতা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হলেও স্বাভাবিক ওজনের মানুষেরও এ রোগ হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয়দের তুলনামূলক কম বয়সে ও কম ওজনেও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকতে পারে।

দ্বিতীয় ভুল ধারণা হলো, শুধু মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয়। বাস্তবে এ রোগের সঙ্গে বংশগত প্রবণতা, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, বয়স ও বিভিন্ন বিপাকীয় কারণ জড়িত। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয় শরীরের ওজন বাড়িয়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে শুধু মিষ্টি খাওয়ার কারণেই ডায়াবেটিস হয়, এমন ধারণা ভুল।

তৃতীয় ভুল ধারণা হলো, ডায়াবেটিস হলে ভাত ও ফল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এ রোগে আক্রান্ত হলে ভাত ও ফল পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কতটুকু খাওয়া হচ্ছে, খাবারের ধরন এবং খাবার গ্রহণের পর ব্যক্তির রক্তে শর্করার মাত্রা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। পরিমিত ভাতের সঙ্গে শাকসবজি ও প্রোটিন এবং উপযুক্ত পরিমাণে আস্ত ফল স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে ফলের রস ও চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলা ভালো।

চতুর্থ ভুল ধারণা হলো, শরীরে কোনো উপসর্গ না থাকলে ডায়াবেটিস নেই। বাস্তবে ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। অতিরিক্ত পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব কিংবা ওজন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ না থাকলেও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেশি থাকতে পারে। তাই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকলে উপসর্গের অপেক্ষা না করে নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা জরুরি।

পঞ্চম ভুল ধারণা হলো, ইনসুলিন নিলে কিডনি নষ্ট হয় কিংবা ইনসুলিনের অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। এ ধারণাও ভুল। ইনসুলিন কিডনি নষ্ট করে না; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলিন ব্যবহার করলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ইনসুলিন জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা। টাইপ ২ ডায়াবেটিসেও রোগীর শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ইনসুলিন নিতে হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইনসুলিন বন্ধ করা বিপজ্জনক।

ষষ্ঠ ভুল ধারণা হলো, ভেষজ ওষুধে ডায়াবেটিস স্থায়ীভাবে সেরে যায়। কোনো ভেষজ উপাদান বা ঘরোয়া পদ্ধতিতে ডায়াবেটিস স্থায়ীভাবে ভালো হয়ে যায়, এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এসব পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে কার্যকর চিকিৎসা বন্ধ করলে ডায়াবেটিসের জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ডায়াবেটিস মানেই স্বাভাবিক জীবনযাপন বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ এবং নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই ডায়াবেটিস সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণার পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি।