মাতৃমানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে নারীর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গাইনিকোলজিক্যাল রোগ, বন্ধ্যত্ব, দীর্ঘমেয়াদি তলপেটের ব্যথা, সহিংসতা ও মানসিক আঘাতের শিকার নারীদের জন্য সমন্বিত সেবা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর মানসিক সুস্থতা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল মিলনায়তনে রয়্যাল কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনেকোলজিস্টসের (আরসিওজি) ইন্টারন্যাশনাল রিপ্রেজেন্টেটিভ কমিটি (আইআরসি), বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। সকাল সাড়ে আটটা থেকে শুরু হয়ে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চলা এই সেমিনারের মূল বিষয়বস্তু ছিল— প্রসূতি ও স্ত্রীরোগবিদ্যায় মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এবং নারী স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তি।
সেমিনারে আরসিওজির আইআরসি বাংলাদেশের চেয়ার অধ্যাপক ডা. ফওজিয়া হোসেন স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব পর্যায়ে সমন্বিত, মানবিক ও সহমর্মিতাপূর্ণ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা বলতে শুধু গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন সময়ে মায়ের জীবন রক্ষা করাকে বোঝায় না। একজন নারীর মানসিক সুস্থতা, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসা করা হলেও মানসিক কষ্ট উপেক্ষিত থাকলে সেই চিকিৎসা পূর্ণাঙ্গ হয় না।
ডা. ফাওজিয়া হোসেন জানান, গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের পর নারীরা বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং মানসিক আঘাতজনিত সমস্যায় ভুগতে পারেন। তবে নারীর মানসিক স্বাস্থ্য কেবল মাতৃত্বকালীন সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গাইনিকোলজিক্যাল ক্যান্সার, বন্ধ্যত্ব, বারবার গর্ভপাত এবং দীর্ঘমেয়াদি তলপেটের ব্যথায় আক্রান্ত নারীরা গভীর মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন।
এ ছাড়া পারিবারিক সহিংসতা ও ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে মানসিক আঘাত, বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও দীর্ঘস্থায়ী ভয় দেখা দিতে পারে। সামাজিক কলঙ্ক, ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা এবং গোপনীয় সহায়তা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা তাঁদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তোলে।
অধ্যাপক ডা. ফওজিয়া হোসেন বলেন, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা, গাইনিকোলজি, ক্যান্সার চিকিৎসা, বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি পেলভিক পেইন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
চিকিৎসকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিএমজে ওপেন জার্নালে প্রকাশিত একটি বহুকেন্দ্রিক গবেষণার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের তিনটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭০৩ জন স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসককে ওই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে দেখা যায়, ৭০ শতাংশ চিকিৎসক বার্নআউটে আক্রান্ত ছিলেন। তাদের দৈনিক গড় ঘুমের সময় ছিল ৬.৩ ঘণ্টা এবং ৬৩.৮ শতাংশ চিকিৎসক দিনে সাত ঘণ্টার কম ঘুমাতেন। প্রায় ৪৭.১ শতাংশ চিকিৎসক স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্য কাজ করতেন। মাত্র ১১.৯ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নিয়েছিলেন বলে জানান।
তিনি জানান, গবেষণায় কম ঘুমের সময়ের সঙ্গে বার্নআউটের স্বাধীন সম্পর্ক পাওয়া যায়। আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে মানসিক ও আবেগীয় ক্লান্তি কম থাকার সম্পর্কও দেখা গেছে। এই ফলাফল স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণের কাঠামো, দায়িত্ব পালনের সময়সূচি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, আর্থিক চাপ, মেন্টরশিপ এবং গোপনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
অধ্যাপক ডা. ফওজিয়া হোসেন বলেন, বার্নআউট ও ক্লিনিক্যাল বিষণ্নতা এক বিষয় নয়। তবে বার্নআউট একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত স্বাস্থ্য সমস্যা, যার সমাধানে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অপরিহার্য। চিকিৎসকেরা অন্যের জীবন ও সুস্থতার জন্য নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। কিন্তু তাঁদের নিজস্ব মানসিক স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ উপেক্ষা করা যায় না। মানসিক সহায়তা চাওয়াকে কখনোই দুর্বলতা বা পেশাগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বাংলাদেশে চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর কর্মক্ষেত্রে সহিংসতাও একটি গুরুতর উদ্বেগ উল্লেখ করে ডা. ফাওজিয়া বলেন, ২০২৫ সালে ডিসকাভার পাবলিক হেলথ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৬০০ জন চিকিৎসক অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা জানান। মৌখিক নির্যাতন ছিল সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট করা সহিংসতার ধরন; এর পরেই ছিল শারীরিক হামলা। গবেষণায় রোগীর স্বজনদের প্রধান সহিংসতাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তিনি জানান, কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা চিকিৎসকদের মধ্যে ভয়, মানসিক চাপ, পেশাগত অসন্তুষ্টি এবং নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করতে পারে। এটি দলগত কাজ, স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা এবং রোগীর চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা ও মানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ডা. ফাওজিয়া বলেন, আরসিওজি আইআরসি বাংলাদেশ মনে করে, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভয়ভীতি, হুমকি ও হামলামুক্ত পরিবেশে কাজ করার অধিকার রয়েছে। চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর সহিংসতাকে চিকিৎসাপেশার অনিবার্য অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া বা উপেক্ষা করা উচিত নয়। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে সহিংসতার ঘটনা রিপোর্ট করার কার্যকর ব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, জরুরি সাড়াদান প্রটোকল, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে রোগী, তাঁদের স্বজন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে সম্মানজনক যোগাযোগ বজায় রাখতে স্বচ্ছ অভিযোগ ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ে মাতৃস্বাস্থ্য, গাইনিকোলজি, ক্যান্সার, বন্ধ্যত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার চিকিৎসায় মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন, চিকিৎসা ও ফলোআপ অন্তর্ভুক্ত করা; ঝুঁকিতে থাকা নারীদের সুরক্ষায় পারিবারিক সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য গোপনীয়, বিচারহীন ও ট্রমা-সচেতন সেবা নিশ্চিত করা; চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণার্থীদের সহায়তায় কর্মপরিবেশ উন্নত করা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ তৈরি, মেন্টরশিপ জোরদার এবং সহজলভ্য ও গোপনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা; কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর রিপোর্টিং ব্যবস্থা, হাসপাতালের নিরাপত্তা এবং হুমকি ও হামলার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্ব জোরদারে পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়ে প্রমাণভিত্তিক নির্দেশিকা, প্রশিক্ষণ, রেফারেল নেটওয়ার্ক এবং রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কল্যাণ মূল্যায়নের মানদণ্ড তৈরি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অধ্যাপক ডা. ফওজিয়া হোসেন পেশাজীবী সংগঠন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং কমিউনিটি পর্যায়ের সেবাদানকারীদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান, যাতে মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার অভিন্ন অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, একজন নারী শুধু তার রোগনির্ণয়, সন্তান ধারণের সক্ষমতা, গর্ভাবস্থার ফলাফল কিংবা ক্যানসারের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নন। একইভাবে একজন চিকিৎসকও শুধু একজন সেবাদানকারী নন; তিনিও একজন মানুষ, যাঁর নিরাপত্তা, সহায়তা ও যত্ন প্রয়োজন। কোনো নারীকে মানসিক কষ্ট কিংবা সহিংসতার শিকার হয়ে নীরবে জীবন কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়। কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীকেও তাঁর পেশার অংশ হিসেবে অপমান, হুমকি কিংবা হামলা মেনে নিতে বাধ্য করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের বিচ্ছিন্ন সেবা থেকে সমন্বিত সেবায়, কুসংস্কার থেকে সহমর্মিতায় এবং কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা থেকে নিরাপত্তা ও জবাবদিহির দিকে এগিয়ে যেতে হবে। নারীর যত্ন নিশ্চিত করার অর্থ হলো, যাঁরা নারীর সেবা করেন, তাঁদের যত্ন ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা।
সেমিনারের বিভিন্ন পর্যায়ে অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) ও আরসিওজি আইআরসি-র প্রাক্তন চেয়ার জাতীয় অধ্যাপক ডা. শাহলা খাতুন, ওজিএসবির প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক ডা. রওশন আরা বেগম, অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার, অধ্যাপক ডা. আনোয়ারা বেগম ও ডা. ম্যাগি অল্রিজ, আরসিওজি আইআরসি বাংলাদেশের সচিব অধ্যাপক খন্দকার শাহনেওয়াজ এবং অধ্যাপক ডা. ফারজানা দিবা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।