‘পশু চিকিৎসক’-স্বাস্থ্য সহকারী-ধাত্রী দিয়ে প্রসব, নবজাতকের মৃত্যুর পর হাসপাতালে প্রসূতি
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে গ্রাম্য ধাত্রী, ‘পশু (ভেটেরিনারি) চিকিৎসক’ ও স্বাস্থ্য সহকারীকে দিয়ে বাড়িতে প্রসব করাতে গিয়ে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ১৮ বছর বয়সি প্রসূতি চাঁদনী আক্তার। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ফেরিঘাটসংলগ্ন শাহাদাত মেম্বার পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। চাঁদনী দরিদ্র রিকশাচালক চানমিয়া শেখ ও চায়না আক্তার দম্পতির মেয়ে। তার স্বামী মুন্নাফ শেখ গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বাসিন্দা। বিয়ের চার বছর পর এটিই ছিল চাঁদনীর প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হওয়া।
অপরদিকে অভিযুক্তরা হলেন—স্থানীয় ধাত্রী রোকেয়া বেগম রুকি, পশু চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত আসলাম আলী সরদার ও স্বাস্থ্য সহকারী লাভলী আক্তার রথী। এর মধ্যে আসলাম আলী স্থানীয়ভাবে পশু চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি হলেও তার ভেটেরিনারি সনদ আছে কিনা—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এলএমএএফ বা পল্লী চিকিৎসক কোর্স করেছেন বলে তিনি দাবি করেছেন। আর লাভলী আক্তার রথী ডিএমএফ সম্পন্ন করার পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রসবের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। তবে তাদের পেশাগত পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৮ অক্টোবর রাত ২টার দিকে চাঁদনীর প্রসবব্যথা শুরু হয়। ভোর ৪টার দিকে রোকেয়া বেগম রুকি নামে স্থানীয় এক ধাত্রীকে ডেকে আনা হয়। দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও প্রসব করাতে না পারায় সকাল ৭টার দিকে আসলাম আলী সরদার নামে এক পশু চিকিৎসককে খবর দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, তিনি প্রথমে চাঁদনীর শরীরে স্যালাইন দেন এবং পরে প্রসবব্যথা বাড়ানোর জন্য একটি ইনজেকশন দেন।
এর প্রায় দুই ঘণ্টা পর শিশুটির মাথা বের হলেও প্রসব সম্পন্ন হচ্ছিল না। পরে আসলামের ডাকে ঘটনাস্থলে যান লাভলী আক্তার রথী নামে এক স্বাস্থ্য সহকারী।
পরিবারের অভিযোগ, তিনি প্রসবের পথের পাশে কেটে শিশুটিকে বের করেন। শিশুটি মৃত অবস্থায় জন্ম নেয়। এরপর চাঁদনীর অতিরিক্ত রক্তপাত শুরু হলে ক্ষতস্থানে গজ দিয়ে সেলাই করা হয় এবং কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। এ কাজের জন্য ৪ হাজার টাকা চাওয়া হলেও দরিদ্র বাবা ৩ হাজার ৬০০ টাকা দেন। পরে সেলাইয়ের স্থানে সংক্রমণ দেখা দিলে চাঁদনীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) তাকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তার অবস্থা জটিল বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
চাঁদনীর বাবা-মা বলেন, আমরা আমাদের নাতিকে হারিয়েছি। এখন চাই, আমাদের মেয়েটা অন্তত সঠিক চিকিৎসা পেয়ে বেঁচে থাকুক। মেয়ের এই পরিণতির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার চাই।
স্বাস্থ্য সহকারী লাভলী আক্তার রথী জানান, চার বছর মেয়াদি ডিএমএফ কোর্স সম্পন্ন করার পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রসব করানোর বিষয়ে প্রশিক্ষণ রয়েছে তার। তিনি দাবি করেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি শিশুটিকে প্রসবপথে আটকে থাকতে দেখেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় শিশুটিকে বের করেন এবং ওষুধ দেন। দীর্ঘ সময় বাড়িতে প্রসবের চেষ্টা করায় মা ও শিশুর অবস্থা আগেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে ‘পশু চিকিৎসক’ আসলাম দাবি করেন, তিনি দীর্ঘ ২২-২৩ বছর ধরে পশু চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষের চিকিৎসাও দিয়ে আসছেন। তার এলএমএএফ বা পল্লী চিকিৎসকের একটি কোর্স সম্পন্ন করা আছে। এ পর্যন্ত গ্রামের বহু নারীর সন্তান তার চিকিৎসায় ভালোভাবে জন্ম নিয়েছে। গ্রামে তার চিকিৎসার সুনাম রয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে চাঁদনীর বাবার বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নেন গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মারুফ হাসান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রসব করানোর মতো চিকিৎসাসেবা দেওয়া উচিত নয়। আসলাম ও রথীর মতো ব্যক্তিদের এ ধরনের সেবা দেওয়ার এখতিয়ার আছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হবে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সিভিল সার্জন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা না হলেও তদন্তের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।