১৯ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৪০

তিন দিনে দুই কারখানায় আগুন, নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রে শতভাগ শুল্কছাড়ে ওষুধ রপ্তানির প্রসঙ্গ কেন আসছে?

ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল এবং ইবনে সিনার কারখানায় আগুন (বাঁ থেকে)  © টিডিসি সম্পাদিত

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশকে বিশেষায়িত ওষুধে শতভাগ শুল্কছাড় সুবিধা দিয়েছে গত ২৯ সেপ্টেম্বর। ফলে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো এখন কোনো বাড়তি ট্যাক্স বা শুল্ক না দিয়েই আমেরিকার বাজারে উচ্চ প্রযুক্তির দামী ওষুধ রপ্তানি করতে পারবে। কিন্তু এই মাইলফলক ছোঁয়ার ২০ দিনের মাথায় গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি ওষুধ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তিন দিনের ব্যবধানে একই জেলায় আরেকটি কারখানা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাছাকাছি সময়ে দেশের শীর্ষ সারির দুটি ওষুধ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘিরে তাই ছড়াতে শুরু করেছে নানা জল্পনা-কল্পনা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, আমেরিকার শুল্কছাড় কার্যকরের পরপর দুটি ওষুধ কারখানার আগুনকে সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে সমসাময়িক বিভিন্ন অগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই এই ঘটনা ঘটায় সন্দেহ বাড়ছে তাদের।

তবে বাংলাদেশে এ ধরনের দুর্ঘটনায় প্রায় স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায় অগ্নিনিরাপত্তা বৃদ্ধিতে মনোযোগ বৃদ্ধির পরামর্শ আরেকটি অংশের। তারা বলছেন, ‘প্যানিক’ না হয়ে প্রয়োজনে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা যেতে পারে।

দুই কারখানায় আগুন, প্রতিষ্ঠান ও ফায়ার সার্ভিস যা বলছে
গত ১৪ অক্টোবর সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে টঙ্গীর চেরাগ আলীতে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ইউনিট-২ ভবনের কেমিক্যাল গুদামে প্রথম আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিটের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা প্রায় ৪ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ভবনের ভেতর ওষুধ তৈরির প্রচুর রাসায়নিক (কেমিক্যাল), ওষুধ প্যাকেটজাতকরণের অ্যালুমিনিয়াম ও রাবার সামগ্রী এবং উৎপাদনসংশ্লিষ্ট মূল্যবান যন্ত্রপাতি থাকায় সেগুলো আগুনে ও ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনও জানাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

আমাদের পুরো জাতিকে আরেক দিকে ব্যস্ত রেখে, এই আসল জায়গাটাতে হিট করা হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করছি যে, পার্টিকুলার সময়টাতে সাইড ইস্যুগুলোতে আমাদের ব্যস্ত রাখা হয়েছিল; কখনও রবীন্দ্রনাথ, কখনও জিন্নাহ, কখনও গরু জবাই। আমরা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করি সাইড ইস্যুগুলো নিয়ে। এগুলোতে সবাই ব্যস্ত থাকে, যেন ওটাই রাষ্ট্রের স্বার্থ, ওটাই রাজনীতির স্বার্থ—আবু রুশদ, সম্পাদক, বাংলাদেশ সিভিল ডিফেন্স জার্নাল

এই ঘটনার তিন দিনের মাথায় ১৭ অক্টোবর বিকাল ৪টা ২০ মিনিটে জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুরে দি ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কারখানার নিচতলার হারবাল সেকশনের কাঁচামাল স্টোরে এই আগুনের সূত্রপাত। ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিটের ১ ঘণ্টার চেষ্টায় এটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। এই ঘটনায় কারখানার উৎপাদিত ওষুধ, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। দুটি কারখানার মধ্যকার সড়ক দূরত্ব প্রায় ২২.৭ কিলোমিটার।

ফায়ার সার্ভিস এবং কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবি, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট এবং কারখানার ভেতরে রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের অসতর্ক সংরক্ষণের কারণে এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে। তবে বিশেষ করে ড্রাগস ইন্টারন্যাশনালের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে প্রতিষ্ঠান ও ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়নি।

ইবনে সিনার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে

অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে ড্রাগস ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম ওই সময় গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, হঠাৎ চারতলা ভবনের চতুর্থ তলা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে শ্রমিকেরা চিৎকার শুরু করেন এবং তাৎক্ষণিক জরুরি অ্যালার্ম বাজানো হয়। কারখানার ওই ফ্লোরে কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ বা কেমিক্যাল ছিল না বলেও দাবি করেছিলেন তিনি। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলেই মত তাদের।

তবে কারখানার তৃতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত এবং দাহ্য পদার্থ ও রাসায়নিক থাকার দাবি করেছে ফায়ার সার্ভিস। ওই সময়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ এবং মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম গণমাধ্যমকে জানান, চারতলা ভবনের তৃতীয় তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে এবং পরবর্তীতে তা পাশের আরেকটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। তারা কারখানা কর্তৃপক্ষের দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জানান, কারখানার ভেতরে প্রচুর পরিমাণে দাহ্য পদার্থ ও রাসায়নিক থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়ায় এবং ফায়ার ফাইটারদের কাজ করতে তীব্র বেগ পেতে হয়।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে ড্রাগস ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃপক্ষ। গত ১৫ অক্টোবর সকালে কারখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফ্যাক্টরি ইনচার্জ) মোহাম্মদ আবু সাঈদের সই করা এক নোটিশে এ তথ্য জানানো হয়। এখনও পর্যন্ত কারখানাটি চালু করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে প্রতিষ্ঠানটির কোনো উদ্যোগও দৃশ্যমান নেই। পরে প্রকৃত কারণ ও সুনির্দিষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসানকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।

যদি কোনো রকমের নিরাপত্তা ঘাটতি থাকে বা এখানে যদি কোনো রকমের ক্রিমিনাল অ্যাটাক হয়ে থাকে, সেটা নিশ্চিতভাবেই পুলিশের দায়দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, এই ধরনের ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। অতীতে একসাথে অনেক ঘটনা একসাথেই কিন্তু ঘটে গেছে। এখন প্রত্যেকটাকে তো আর আপনি নিরাপত্তা ইস্যু বা ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটি ধরতে পারবেন না। সুতরাং, এখানে একটা তদন্ত করে নিরূপণ করা উচিত। তবে তার চেয়ে এই মুহূর্তে সবচাইতে বেশি দরকার হলো— সব কিছুকে একটা স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে নিয়ে আসা এবং এই সব ধরনের ফ্যাক্টরিকে একটি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সে পরিণত করা—অধ্যাপক ড. সাহাব এনাম খান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কমিটি গঠনের তথ্য জানিয়ে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন অফিসার শাহীন আলম রবিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানাতে পারেনি। এ বিষয়ে তারা কোনো উদ্যোগও নেননি। কর্তৃপক্ষ কারখানার কার্যক্রম চালু করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে সরকারকে আগুন লাগাসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন আকারে জানাতে হয়। তাই ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ইবনে সিনার ওষুধ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, ওই দিন বিকেল আনুমানিক ৪টা ২০ মিনিটের দিকে ছয়তলা মূল ভবনের নিচতলায় অবস্থিত হারবাল সেকশন বা র-মেটেরিয়ালস স্টোরে হঠাৎ আগুন দেখা যায়। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই অটোমেটিক সেফটি প্রোটোকল মেনে সাইরেন বাজানো হয় এবং কারখানার নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ টিম প্রাথমিক প্রতিরোধ শুরু করে।

ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলেও সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নিরূপন হয়নি

ওই সময়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম গণমাধ্যমকে বলেন, আগুন মূলত নিচতলার স্টোর রুমের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং ৬টি ইউনিটের চেষ্টায় এক ঘণ্টার মধ্যে তা নেভানো সম্ভব হয়। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ শর্ট সার্কিট নাকি অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে স্টোরে থাকা লতাগুল্ম ও হারবাল কাঁচামালের কারণে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন তারা।

জানতে চাইলে তালহা বিন জসিম সোমবার (১৯ অক্টোবর) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ইবনে সিনার কারখানার আগুনটি ছোট ঘটনা, ওই রকম বড় কিছু ছিল না। ক্ষয়ক্ষতি কিছু হয়েছে, তবে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের চেয়ে এটা ছোট। অগ্নিনির্বাপনে নিয়োজিত টিম সম্ভাব্য কারণ হিসেবে শর্ট সার্কিটের কথা জানিয়েছে। তবে ছোট ঘটনা, এজন্য হয়তো অধিকতর তদন্ত হবে না।

তিনি বলেন, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ঘটনা তদন্তে কমিটি হয়েছে, ওইটা ‘বিগ ইভেন্ট’ ছিল। বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কমিটি প্রতিবেদন দিলে কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও ওষুধ শিল্প সংশ্লিষ্টরা কী বলছেন
গাজীপুরের দুটি ওষুধ কারখানায় অল্পদিনের ব্যবধানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নানা ডালপালা ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। অনেকের ইঙ্গিত, যুক্তরাষ্ট্রের শূন্য শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশের ওষুধশিল্প ধ্বংস করতে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশ গোয়েন্দা অপারেশন চালিয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে এই অগ্নিকাণ্ডগুলোর ‘টাইমিং’ বা সময়কাল তাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

তথ্য বলছে, চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের (আমেরিকা) মধ্যকার বহুল আলোচিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মূলত ২০১৫ সাল থেকে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক মূলত ‘টিকফা’ চুক্তির আওতায় পরিচালিত হচ্ছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে এই মুক্ত বাণিজ্য বা দ্বিপাক্ষিক রেসিপ্রোকাল চুক্তির আলোচনা শুরু হয়, যা ৯ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত রূপ পায়।

এরই মধ্যে চলতি বছরের ২ এপ্রিল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশেষ আইন (সেকশন ২৩২) জারি করে ঘোষণা দেন যে, আমেরিকার বাইরে থেকে আসা সমস্ত পেটেন্টেড এবং উচ্চ প্রযুক্তির বিশেষায়িত ওষুধের ওপর শতভাগ শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপ করা হবে। এতে বাংলাদেশে তৈরি কোনো বিশেষায়িত ওষুধের দাম যদি ১০০ টাকা হয়, তবে আমেরিকায় ঢুকতে আরও ১০০ টাকা ট্যাক্স দিতে হতো। ফলে মার্কিন বাজারে ওই ওষুধের দাম হয়ে যেত ২০০ টাকা। এত বেশি দামের কারণে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে পারত না। কিন্তু গত ২৮-২৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ যে চূড়ান্ত ছাড়পত্র দিয়েছে, তার মাধ্যমে বাংলাদেশকে এই ১০০% শুল্কের আওতামুক্ত বা তালিকায় ‘ব্যতিক্রম’ ঘোষণা করা হয়েছে।

এক ঘণ্টার চেষ্টায় ইবনে সিনার আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা

এর ফলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো যখন আমেরিকায় বিরল রোগ, ক্যান্সার থেরাপি বা ফার্টিলিটি ড্রাগস (বন্ধ্যত্বের ওষুধ) রপ্তানি করবে, তখন তাদের শূন্য শুল্ক দিতে হবে। এতে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের দাম কম থাকবে এবং মার্কিন ক্রেতারা সস্তায় এই ওষুধ কিনতে পারবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণে গুটিকয়েক দেশের মতো বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রে একচেটিয়া বাণিজ্য করতে পারবে। তা ছাড়া আমেরিকার ওষুধের বাজার পৃথিবীর সবচেয়ে বড়। এই শুল্কছাড়ের কারণে ভারত বা চীনের মতো বড় দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক সুবিধায় এগিয়ে যাচ্ছে।

তারা বলছেন, বাংলাদেশ আগে শুধু সাধারণ জেনেরিক ওষুধ (যেমন প্যারাসিটামল বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ) রপ্তানি করত, যা থেকে আয় হতো বছরে মাত্র ২০ মিলিয়ন ডলার। এই ছাড়পত্রের ফলে ক্যান্সার ও জিন থেরাপির মতো উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত ওষুধ রপ্তানি করে আগামীতে বিলিয়ন ডলার আয়ের পথ খুলে গেছে। এ অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলো দেশের ওষুধ শিল্প ধ্বংসে গোপন অপারেশন পরিচালনা করে থাকতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক আবু রুশদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এই যে হঠাৎ করে বিভিন্ন ওষুধ প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগছে, এর আগে অপসোনিনে লেগেছে, বেক্সিমকোতে লেগেছে, এখন ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, ইবনে সিনা—এগুলা অনেক বড় ওষুধ প্রতিষ্ঠান। ওষুধ তৈরির সক্ষমতা বিবেচনায় এগুলো আমাদের দেশে অনেক বড় ইন্ডাস্ট্রি। ঘটনাটা এমন সময়ে ঘটেছে যখন যুক্তরাষ্ট্র আমাদেরকে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে। এখন, এ নিয়ে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। হয়তো কেউ চায় না যে বাংলাদেশের ওষুধ ওই সব দেশে যাক, কারণ এতে তাদের মার্কেট কমে যাবে। এগুলাকে ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স বলে।

ইউএসএর ট্যারিফের বিষয়টায় আসলে যে ধরনের ড্রাগের কথা বলা হচ্ছে, তার মোস্ট অব দ্য ড্রাগই আমরা বাংলাদেশে ওরকম বানাই না। এটা ওপেন হওয়ার ফলে যেটা হয়েছে, ধরেন আজকে এটার জন্য ওপেন হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়তো আরও দুইটা প্রোডাক্টের জন্য ওপেন হলে তখন আমাদের জন্য অপরচুনিটিটা ওপেন হবে। দ্বিতীয় কথা, এখন তো আমরা ওষুধগুলো বানাচ্ছি না, দুই বছর পরে যদি ওষুধগুলো বানাতে পারি, তখন আমরা এই জিরো ট্যারিফের সুবিধাটা পাব। ফলে ওই ট্যারিফের সাথে বা অন্য কোনো ডিসিশনের সাথে এটাকে আমরা মিলাতে পারছি না—ডা. মো. জাকির হোসেন, সাবেক মহাসচিব, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বাপি)

তিনি বলেন, আমি এভাবে দেখছি কারণ, যুক্তরাষ্ট্র আমাদেরকে শূন্য শুল্কে দিয়েছে, বিপরীতে আমাদের প্রতিবেশী একটা দেশকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১০০% ট্যারিফের হুমকি দিয়েছেন। সেখানে তাদের অনেক পণ্যের ট্যারিফ আমাদের থেকে বেশি। বাণিজ্যিক চুক্তি করার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের শুল্ক একটা রিজনেবল পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। এজন্য আমাদের গার্মেন্ট রপ্তানি সেখানে বেড়েছে। এখন যদি শূন্য শুল্কে সেখানে আমাদের ওষুধ বিক্রি অনেক বেড়ে যায়—আমাদের কোয়ালিটি সম্পন্ন বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলো ওষুধ বিক্রি করতে পারবে। সুতরাং, আমাদেরকে এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে, আমাদের প্রতিদ্বন্দী কারা? তারা তো আঘাত হানবেই, এটা সকল জায়গায়তে হয়।

অগ্নিকাণ্ডের আগে-পরে ‘অগুরুত্বপূর্ণ’ বিষয়ে ‘ব্যস্ত রাখা’র বিষয়েও সতর্ক দৃষ্টি এই নিরাপত্তা বিশ্লেষকের। তিনি বলেন, আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে যে, আমাদের পুরো জাতিকে আরেক দিকে ব্যস্ত রেখে, এই আসল জায়গাটাতে হিট করা হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করছি যে, পার্টিকুলার সময়টাতে সাইড ইস্যুগুলোতে আমাদের ব্যস্ত রাখা হয়েছিল; কখনও রবীন্দ্রনাথ, কখনও জিন্নাহ, কখনও গরু জবাই। আমরা অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করি সাইড ইস্যুগুলো নিয়ে। এগুলোতে সবাই ব্যস্ত থাকে, যেন ওটাই রাষ্ট্রের স্বার্থ, ওটাই রাজনীতির স্বার্থ। কিন্তু আমাদের যে জননিরাপত্তার ব্যাপার আছে, আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপার আছে, আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে যে অনেক ঘটনা ঘটছে, নিরাপত্তার ব্যাপার আছে—এগুলো কিন্তু ঠিকমতো মিডিয়ায় আনছি না বা আলোচনা হচ্ছে না।

সম্প্রতি শুল্কমুক্ত সুবিধা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে এক কথায় এমন নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখতে নারাজ আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. সাহাব এনাম খান। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, আমি মনে করি না যে এই মুহূর্তে এটাকে নিয়ে প্যানিক করার কিছু আছে। প্রথমত, সার্বিকভাবে বাংলাদেশের শিল্প এলাকাগুলোতে অগ্নি-নির্বাপণ ব্যবস্থা মোটেও পর্যাপ্ত না। বর্তমানে বেশিরভাগ গার্মেন্টস কারখানা গ্লোবাল কমপ্লায়েন্সে পরিণত হয়েছে, কিন্তু বাকি ফ্যাক্টরিগুলোতে এসব ব্যাপারে মোটেও কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। দ্বিতীয়ত, ফ্যাক্টরিগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে ধরনের জায়গায় অবস্থিত, সেখানে আসলে অগ্নিনিরাপত্তা পরিবহন বা  ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি যেতে পারে না। একই সাথে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়াতে হসপিটালাইজেশনের ব্যবস্থাও নাই। অর্থাৎ কারখানাগুলো সম্পূর্ণভাবেই গড়ে ওঠে যত্রতত্রভাবে।

এসব কারণে অগ্নিকাণ্ড এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারখানাগুলোতে যে ধরনের ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, তা অত্যন্ত নিম্নমানের। এসবের গুণগত মান কন্ট্রোল করার কোনো জায়গা নাই বাংলাদেশে। কেউ এটা করে না। ফলে এই ধরনের দুর্ঘটনাগুলো ঘটাটা অস্বাভাবিক কিছু না। একটা নিত্যনৈমিত্তিক সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে কিন্তু ভয়ংকর রকমের অগ্নিকাণ্ড ঘটে যায়।

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, যদি কোনো রকমের নিরাপত্তা ঘাটতি থাকে বা এখানে যদি কোনো রকমের ক্রিমিনাল অ্যাটাক হয়ে থাকে, সেটা নিশ্চিতভাবেই পুলিশের দায়দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, এই ধরনের ঘটনা প্রায়শই ঘটছে। অতীতে একসাথে অনেক ঘটনা একসাথেই কিন্তু ঘটে গেছে। এখন প্রত্যেকটাকে তো আর আপনি নিরাপত্তা ইস্যু বা ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটি ধরতে পারবেন না। সুতরাং, এখানে একটা তদন্ত করে নিরূপণ করা উচিত। তবে তার চেয়ে এই মুহূর্তে সবচাইতে বেশি দরকার হলো— সব কিছুকে একটা স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে নিয়ে আসা এবং এই সব ধরনের ফ্যাক্টরিকে একটি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সে পরিণত করা।

তবে ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী অগ্নি ও দুর্যোগনিরাপত্তা (এফডি সিকিউরিটি) ব্যবস্থা থাকে বলে জানিয়েছেন ওষুধশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপি) সাবেক মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, যদিও ফার্মাসিউটিক্যালের এফডি-সিকিউরিটি অনেক বেশি স্ট্রং, তারপরেও এক্সিডেন্ট তো এক্সিডেন্টই। কারণ ফার্মাসিউটিক্যালে অনেক কেমিক্যাল থাকে, প্রাইমারি প্যাকেজিংগুলোতে ফল্ট থাকে, ভালনারেবিলিটি থাকে। ফলে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা যে ঘটতে পারে না, তা না। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিকদের কাছ থেকে যতটুকু জানতে পারছি, সেটা হচ্ছে ইট ওয়াজ অ্যান এক্সিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের শূন্য শুল্ক সুবিধার বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করলেন ঔষধ শিল্প সমিতির এই নেতা। তিনি বলেন, ইউএসএর ট্যারিফের বিষয়টায় আসলে যে ধরনের ড্রাগের কথা বলা হচ্ছে, তার মোস্ট অব দ্য ড্রাগই আমরা বাংলাদেশে ওরকম বানাই না। এটা ওপেন হওয়ার ফলে যেটা হয়েছে, ধরেন আজকে এটার জন্য ওপেন হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়তো আরও দুইটা প্রোডাক্টের জন্য ওপেন হলে তখন আমাদের জন্য অপরচুনিটিটা ওপেন হবে। দ্বিতীয় কথা, এখন তো আমরা ওষুধগুলো বানাচ্ছি না, দুই বছর পরে যদি ওষুধগুলো বানাতে পারি, তখন আমরা এই জিরো ট্যারিফের সুবিধাটা পাব। ফলে ওই ট্যারিফের সাথে বা অন্য কোনো ডিসিশনের সাথে এটাকে আমরা মিলাতে পারছি না। স্রেফ এক্সিডেন্ট হিসেবেই দেখছি। তবে যদি বিশেষ কোনো কিছু হয়ে থাকে, তাহলে তো আমরা বুঝতে পারব না, এটা নিরাপত্তা এজেন্সি হয়তো বলতে পারবে।