১৪-১৬তম থেকে সোজা ১০ম গ্রেডের অ্যাডমিন অফিসার ২০ কর্মচারী
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ১৪ ও ১৬তম গ্রেডের ২০ কর্মচারীকে এক লাফে ১০ম গ্রেডে ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শূন্য পদ না থাকার পরও ভূতাপেক্ষভবে পদোন্নতি দিয়ে এসব কর্মচারীকে বিভিন্ন দপ্তরে পদায়ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই পদে পদোন্নয়ন পেয়েছেন টেলিফোন অপারেটর এবং ক্যাথল্যাব সহকারীর মতো টেকনিক্যাল স্টাফরাও। ‘বৈষম্যের শিকার ও বঞ্চিত’ হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া এসব কর্মচারীর বড় অংশই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, বৈষম্যের শিকার এসব কর্মচারীকে পদোন্নতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পদ না থাকার পরও এই পদোন্নতি ‘সুপারনিউমারারি’ হিসেবে হয়েছে বলে দাবি তাদের। যদিও নথিপত্রে এর প্রমাণ মেলেনি।
তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণহত্যার মামলায় দণ্ডিত শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক সপ্তাহের মধ্যে ‘পদোন্নতিবঞ্চিত’ দাবি করে বিধিবহির্ভূতভাবে একযোগে ১০ম ও ৯ম গ্রেডে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন ৬১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর মধ্যে ১৪ ও ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী ছিলেন অন্তত ২২ জন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরপর সংঘটিত এই ঘটনায় তৎকালীন আওয়ামীপন্থী উপাচার্য অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক সম্মতি জ্ঞাপন করেন। তৎকালীন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এবিএম আব্দুল হান্নান এক প্রজ্ঞাপনে এই পদোন্নতির তথ্য জানিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে এই পদোন্নতির ঘটনাকে ‘বিধি অনুযায়ী’ সম্পাদনের উদ্যোগ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট পদোন্নতি বিধিমালা না থাকায় ওই বছরের ২ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৩তম সিন্ডিকেট সভায় ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী (গ্রেড ৯-৩ এবং ২০-১০) নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদোন্নয়ন সংবিধি’ সংশোধনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদকে সভাপতি করে গঠিত এই কমিটিতে মোট ৮ জন সদস্য ছিলেন।
২০২৪ সালের ২১ ডিসেম্বর এই কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিটি ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীদের ৮ বছরে ১১তম গ্রেড ও পরবর্তী ৬ বছরে ১০ম গ্রেড এবং ১৪তম গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ৬ বছরে ১১তম ও পরবর্তী ৬ বছরে ১০ম গ্রেডে পদোন্নতির সুপারিশ করে।
এদিকে জোর করে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়া এসব কর্মচারীকে পুনরায় সুপারিশের আলোকে পদোন্নয়নের জন্য ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আরেকটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ (অবসরপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতারকে সভাপতি করে গঠিত এই কমিটিতে সদস্য সচিব ছিলেন অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ডা. মো. দেলোয়ার হোসেন। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন—পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) খন্দকার শফিকুল হাসান, অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) নাছির উদ্দিন ভূঁঞা, উপ-রেজিস্ট্রার (আইন) ডা. আবু হেনা হেলাল উদ্দিন আহমেদ এবং আইনজ্ঞ হিসেবে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন ও অ্যাডভোকেট শাহ মোহাম্মদ মাহফুজুল হক। এর মধ্যে মাহফুজুল হক শাহবাগ থানা পশ্চিম জামায়াতের আমির।
যারা পদোন্নতি পেয়েছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত ছিলেন। সেই বঞ্চিতদেরই পদোন্নতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হয়েছে। এটাকে যদি অন্যায় বলা হয় তবে কিছু বলার নেই— অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
মাত্র ৪ দিনের ব্যবধানে ২০ ফেব্রুয়ারি আগের কমিটির সুপারিশের আলোকে ২২ জনের মধ্যে ২০ কর্মচারীকে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতির সুপারিশ করে এই কমিটি। পরবর্তীতে ৯৫ থেকে ৯৮তম সিন্ডিকেটেও পদোন্নতির বিষয়টি আলোচিত হয়। চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৯৮তম সিন্ডিকেটে এই পদোন্নতি চূড়ান্তভাবে পাস হয়। পরে ৩১ মার্চ তৎকালীন রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই পদোন্নতি কার্যকর করা হয়।
পদোন্নতি পেয়েছেন যারা
১৪তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মচারী রয়েছেন ১৩ জন। তারা সবাই উচ্চমান সহকারী পদে কর্মরত ছিলেন। এসব কর্মচারী হলেন—মুহাম্মদ মমিনুল হক (ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ), মো. ফয়ছল হোসেন (পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়), শিরিন আক্তার (ইউরোলজি বিভাগ), মোহাম্মদ মতিউর রহমান (উপাচার্য কার্যালয়), জোলেখা বেগম (হেমাটোলজি বিভাগ), মাহমুদা (ভাইরোলজি বিভাগ), মো. মুস্তাফিজুর রহমান (রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং), কামরুন নাহার খুকী (ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন), নাসের উদ্দিন ভূঁইয়া (নেফ্রোলজি বিভাগ), মো. আবু ওমর (প্যাথলজি বিভাগ), খাজা মঈন উদ্দিন দেওয়ান (ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগ), ইয়াসমিন আরা (হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়) এবং মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম (প্রোভিসি প্রশাসনের কার্যালয়)। এর মধ্যে মো. ফয়ছল কেন্দ্রীয় যুবদল নেতা।
অপরদিকে ১৬তম গ্রেডের পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মচারী রয়েছেন ৭ জন। এর মধ্যে রয়েছেন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসের টেলিফোন অপারেটর জাহাঙ্গীর হোসেন, রেজিস্ট্রার অফিসের ক্যাথল্যাব সহকারী মো. আক্তার হোসেন প্রধান। বাকি ৫ জন অফিস সহকারী পদে কর্মরত ছিলেন। তারা হলেন—মো. ইলিয়াস খাঁন (ট্রেজারার অফিস), আব্দুস সামাদ মিয়া (অনকোলজি বিভাগ), আবুল হাসান (রেজিস্ট্রার অফিস), আমেনা খাতুন (প্যাথলজি বিভাগ) ও সহিদুর রহমান মিঞা (ফিজিওলজি বিভাগ)।
এর মধ্যে জাহাঙ্গীর হোসেন বিএমইউ শাখা বিএনপির সভাপতি এবং ইলিয়াস খাঁন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী সমিতির কোষাধ্যক্ষ। আক্তার হোসেন প্রধান ও ইলিয়াস খাঁন সম্পর্কে খালাত ভাই।
নথিপত্র অনুযায়ী, ১৪তম গ্রেডের কর্মচারীরা ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের বিভিন্ন তারিখে ১১তম গ্রেড এবং ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের বিভিন্ন তারিখে ১০ম গ্রেডে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি পান। একইভাবে ১৬তম গ্রেডের কর্মচারীরা ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের বিভিন্ন তারিখে ১১তম গ্রেড এবং ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের বিভিন্ন তারিখে ১০ম গ্রেডে পদোন্নতি পান।
‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরেক তালিকায় আওয়ামী আমলের নিয়োগপ্রাপ্তরা
২০২৪ সালের ১২ আগস্ট ৬১ কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৩ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত যে সকল কর্মচারী যোগদান করে অদ্যাবধি পদোন্নয়ন বঞ্চিত, সে সকল কর্মচারীদের মধ্য থেকে ৬১ জন কর্মচারীকে বর্ণিত তারিখ ও পদে ভূতাপেক্ষভাবে জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ ও ২০১৫ অনুযায়ী পদোন্নতি ও আপগ্রেডিং দেওয়া হলো।’
সুপারিশকৃতদের পদোন্নয়ন দিলে পরবর্তীতে অবসর গ্রহণের সময় অডিট আপত্তি আসবে, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য বিব্রতকর হবে— অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান (৯৮তম সিন্ডিকেটে), তৎকালীন ইউজিসি সদস্য
ওই তালিকা থেকে ২০ জনকে ৯৮তম সিন্ডিকেটে পদোন্নতির পাশাপাশি বাকিদেরও বড় একটি অংশকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে যাচাই করে সেখানকার অন্তত ৪ জনের ক্ষেত্রে আওয়ামী আমলে নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের কম্পিউটার অপারেটর মেহেদী হাসান ২০১৭, অবস অ্যান্ড গাইনি বিভাগের সহকারী কাম হিসাব রক্ষক মোহাম্মদ সাহাদাত হোসেন ২০০৯, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এ কে এম সাইদুল ইসলাম ১৯৯৯ এবং পেডিয়াট্রিক ডেন্টিস্ট্রি বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট সোহরাব হোসেন ২০১৪ সালে নিয়োগ পান।
আছে আলোচনা-সমালোচনা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতি প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই আপত্তি ছিল। বিশেষ করে সিন্ডিকেট সভাতেও আপত্তি উঠেছে এই পদোন্নতি নিয়ে। যদিও শেষ পর্যন্ত পদোন্নতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সিন্ডিকেট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৫তম সিন্ডিকেট সভায় সংবিধি সংশোধন কমিটি এবং পদোন্নয়ন প্রস্তাবনা কমিটির সুপারিশ উত্থাপন করা হলে এতে বেশ কিছু আপত্তি তোলেন সদস্যরা। তবে ওই সময়ে একজন সিন্ডিকেট সদস্য ‘পদোন্নতি প্রস্তাবনা কমিটি’তে ‘আইনজ্ঞ’ এবং অর্থ বিভাগের সদস্যরা রয়েছেন জানিয়ে সেই কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মত দেন।
এদিকে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় ৯৮তম সিন্ডিকেট সভায় পুনরায় আপত্তি ওঠে। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তৎকালীন সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান সতর্ক করে বলেন, সুপারিশকৃতদের পদোন্নয়ন দিলে পরবর্তীতে অবসর গ্রহণের সময় অডিট আপত্তি আসবে, যা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য বিব্রতকর হবে। একই সঙ্গে পদ সৃষ্টি করে তাদের পদোন্নতি দেওয়া যায় বলেও মত দেন তিনি।
একই মত দেন মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (চিকিৎসা শিক্ষা) মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, সিন্ডিকেট সভায় এই পদোন্নতি অনুমোদন দেওয়া হলে পরবর্তীতে প্রশাস সমস্যার সম্মুখীন হবে।
ওই সভায় তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমও পদের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে তৎকালীন উপাচার্য (অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হক) যে কিছুদিন অফিস করেছেন, তিনি বেশ কিছু পদোন্নয়ন দিয়ে গেছেন। একই সাথে তিনি লিখে দিয়েছেন যে বিধি মোতাবেক পদোন্নতি দেওয়া যায়। তবে বাস্তবে কিছু প্রার্থীকে এমন পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব পদের কোনো অস্তিত্ব নাই। এক্ষেত্রে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্ত পদগুলো সৃষ্টি করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
যাদেরকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে বছরের পর বছর সরকার এদের কিচ্ছু দেয় নাই। ৫ আগস্টের পর সব দল বেঁধে এসে দীন মোহাম্মদ (তৎকালীন ভিসি) স্যারকে ধরল। দীন মোহাম্মদ স্যার কী করলেন, নির্বাহী আদেশে সবাইকে পদোন্নতি দিয়ে দিলেন। কিন্তু সেটা তো সিন্ডিকেটে অনুমোদন করতে হবে। এজন্য পদোন্নতি বোর্ড গঠন করে যাচাই-বাছাই শেষে সেটাই করা হয়েছে—অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদ, বিএমইউ প্রক্টর ও সদস্য, সংবিধি সংশোধন কমিটি
নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতি নিয়ে অস্বস্তি আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। ‘শাস্তির মুখে পড়ার ভয়ে’ নাম প্রকাশ করতে চান না তারা। তবে বলছেন, এভাবে ঢালাওভাবে এত কর্মচারীকে দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি দেওয়া হলেও বিভিন্ন বিভাগে আরও বঞ্চিত কর্মকর্তা রয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী আমলে নিয়োগ পাওয়া কিংবা ভিন্ন মতাবলম্বী হওয়ায় তাদের পদোন্নতির আওতায় নিয়ে আসা হয়নি।
একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, চাকরি জীবনের শুরু থেকেই যিনি কার্ডিওলজি বিভাগের ওটি এবং ক্যাথল্যাবে টেকনিক্যাল স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন, তাকে জুলাই বিপ্লবের পর হঠাৎ করে শিক্ষা শাখার মতোন বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরত্বপূর্ণ দপ্তরে প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। যদিও পদোন্নতিপ্রাপ্ত ওই কর্মচারীর সিনিয়ররা এখনও ক্যাথল্যাব সহকারী হিসেবে চাকরি করছেন।
অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ৯৩তম সিন্ডিকেট সভায় যখন বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর হালনাগাদকৃত কোনো পদোন্নতি নীতিমালা ছিল না, নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতির জন্য সংবিধি সংশোধন করা হয়েছে। তাহলে সম পদ ও গ্রেডভিত্তিক বাকি কর্মচারীদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কী? অনেকেই আছে, যারা ১০ বছর বা তারও অধিক সময় থেকে পদোন্নতি পায়নি, তারা কি বঞ্চিত নন?
তিনি বলেন, প্রতি ৮ ও ৬ বছরে একটি করে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ২০০৬ সালের পরে নিয়োগ পেয়েছেন এমন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, যারা এখনও পদোন্নতি পাননি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিয়ে ভাবছে না। তা ছাড়া আওয়ামী আমলে নিয়োগ পাওয়া বেশ কয়েকজন এখন বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পদোন্নতি পেয়েছে। বাকিদের কী হবে?
যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলমকে প্রশ্ন করা হলে তিনি ‘দাপ্তরিক রেফারেন্সের জন্য’ রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে বর্তমান রেজিস্ট্রার প্রফেসর ডা. মো. মোস্তফা কামালের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনেও তিনি সাড়া দেননি। তৎকালীন রেজিস্ট্রার ও পদোন্নয়ন প্রস্তাবনা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার এবং বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তৎকালীন রেজিস্ট্রার ও বর্তমান উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম সংবিধি সংশোধন কমিটির সভাপতি ও উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সংবিধি সংশোধন কমিটির সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, যাদেরকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে বছরের পর বছর সরকার এদের কিচ্ছু দেয় নাই। ৫ আগস্টের পর সব দল বেঁধে এসে দীন মোহাম্মদ (তৎকালীন ভিসি) স্যারকে ধরল। দীন মোহাম্মদ স্যার কী করলেন, নির্বাহী আদেশে সবাইকে পদোন্নতি দিয়ে দিলেন। কিন্তু সেটা তো সিন্ডিকেটে অনুমোদন করতে হবে। এজন্য পদোন্নতি বোর্ড গঠন করে যাচাই-বাছাই শেষে সেটাই করা হয়েছে।
বৈষম্য নিরসনের উদ্দেশ্যেই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা আওয়ামী আমলে নিয়োগ পেয়েছিল বলা হচ্ছে, তারা আগেই নিয়োগ পেয়েছিল, কিন্তু স্থায়ী হয়নি। আওয়ামী লীগ তাদের চাকরি অস্থায়ী করে আটকে রেখেছিল দীর্ঘদিন। যখন তারা স্থায়ী হয়েছে, সেটাকেই নিয়োগের দিন হিসেবে ধরা হয়েছে। আর যারা এরপরও পদোন্নতি পায়নি, তাদের হয়তো ঝামেলা আছে। ফ্যাসিস্টের দোসর। কারণ এখানে ৪ আগস্টে বড় ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে অনেকের চাকরিও চলে গেছে।
প্রতি ৮ ও ৬ বছরে একটি করে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ২০০৬ সালের পরে নিয়োগ পেয়েছেন এমন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন, যারা এখনও পদোন্নতি পাননি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিয়ে ভাবছে না। তা ছাড়া আওয়ামী আমলে নিয়োগ পাওয়া বেশ কয়েকজন এখন বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পদোন্নতি পেয়েছে। বাকিদের কী হবে— নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা
সংবিধি সংশোধন কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, যারা পদোন্নতি পেয়েছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত ছিলেন। সেই বঞ্চিতদেরই পদোন্নতি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হয়েছে। এটাকে যদি অন্যায় বলা হয় তবে কিছু বলার নেই। যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, তাদেরকে মূলত ‘সুপারনিউমারারি’ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
অডিট আপত্তি নিয়ে সতর্ক ও পদোন্নতি নীতিমালা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি অডিট আপত্তি আসে তো আসবে। তবে সরকারি কর্মচারীদের নির্ধারিত পদোন্নতির প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। গেজেটের নিয়ম অনুযায়ী ১৬তম গ্রেড থেকে আট বছরে ১১তম গ্রেড এবং পরবর্তীতে আরও ছয় বছরে ১০ম গ্রেড পাওয়ার কথা। আমরা সেই বিধিমালা মেনেই কাজ করার চেষ্টা করছি। এর মাঝেও হয়তো কেউ বঞ্চিত থেকে যেতে পারেন, কারণ দীর্ঘ ১৭ বছর অনেকেই বিভিন্নভাবে বঞ্চিত ছিলেন। এরই মধ্যে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। অনেক সময় মন থেকে অনেক কিছু করা যায় না, মেনে নিতে হয়।