চিকিৎসা অবহেলায় বাবাকে ‘হত্যা’র অভিযোগ চিকিৎসকের, লিখলেন—সারাজীবন অভিশাপ দিলেও কি আমার পাপ হবে?
বাবার মৃত্যুর ঘটনায় নিজ প্রতিষ্ঠানসহ দুই হাসপাতালের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী ডেন্টাল সার্জন ও ৩৯তম বিসিএসের (স্বাস্থ্য) কর্মকর্তা ডা. তানিয়া আফরিন মিতুল। কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর কৃত্রিম শ্বাসপ্রদানের নামে নাটক সাজানোর অভিযোগ তুলে তিনি বলছেন, প্রকৃতপক্ষে তার চোখের সামনেই শ্বাসরোধ করে তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে ডা. মিতুল এসব অভিযোগ আনেন। তিনি জানান, তার বাবা তার দুই শিশুকে দেখাশোনা করতেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি অসুস্থ বোধ করলে তাকে প্রথমে নিজ কর্মস্থল ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরবর্তীতে রাজশাহী হার্ট ফাউন্ডেশনে নেওয়া হয়। উভয় প্রতিষ্ঠানেই অবহেলার শিকার হন তিনি। হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে অকেজো লাইফ সাপোর্ট ও অক্সিজেন সরবরাহহীনতায় তার বাবার মৃত্যু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে ডা. তানিয়া আফরিন মিতুল লিখেছেন, ‘আমার বাবাকে গত ১৮.৯.২০২৬ তারিখ শুক্রবার সকালে আনুমানিক সাতটার পর পর শ্বাসকষ্ট নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঈশ্বরদীতে নিয়ে যাওয়া হয়। বাসায় ছোট ছোট দুইটা বাচ্চাকে ম্যানেজ করে হসপিটালে পৌঁছাতে আমার সাড়ে ৮টা বেজে যায়। আমি আমার নাইট ডিউটিরত কলিগকে ফোনে ইনফর্ম করেছিলাম যে বাবার সিওপিডি (ফুসফুসের দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টের সমস্যা) আছে। তিনি শুধুমাত্র সিওপিডির ম্যানেজমেন্ট দিয়ে বাবাকে দোতালায় ইনডোরে পাঠিয়ে দেন।’
নিজ প্রতিষ্ঠানে অবহেলার বিবরণ দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘হসপিটালে গিয়ে দেখি দোতালায় ইনডোরে গিয়ে বাবা বারান্দায় একটা বেডে গরমের মধ্যে শ্বাসকষ্টে আরও বেশি অস্থির হয়ে আছেন। আমি দৌড়ে ইমারজেন্সিতে চলে আসি আর একটা ইসিজি এডভাইস করতে বলি মর্নিং ইমারজেন্সি ডক্টরকে। তিনি জানতেন না যে একজন ইমারজেন্সি পেশেন্ট দোতালায় আছেন। নাইট ডক্টর তাকে ইনফর্ম করে যাননি।’
ওয়ার্ডবয় টিউব খুলে বলে যে ১০০% ফ্লো আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি টিউবের মুখে হাত রেখে দেখেছি সেখানে airflow বলতে কিছুই ছিল না। আমাকে মিথ্যা বলা হচ্ছিল। বোকা বানানো হচ্ছিল। ওরা হয়তো ভেবেছিল আমি সেই মুহূর্তে কিছুই বুঝতে পারবো না। এভাবে আমার বাবাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা হয়েছে। এটা হত্যা, এটা ক্রাইম— ডা. তানিয়া আফরিন মিতুল
সকালের অন্তর্বিভাগের চিকিৎসকের রাউন্ড দেওয়ার কথা ছিল জানিয়ে তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি তাকে ফোন দিলে তিনি বলেন যে দশটায় রাউন্ড শুরু করবে। বাবার অবস্থা দেখে আমি কান্না করছিলাম আর ভাবছিলাম মানবিকভাবে আমার পাশে দাঁড়ানোর মত কোন কলিগ নেই।’
অনুরোধ করার পরও ইসিজি করাতে তিন ঘণ্টা সময় ক্ষেপন করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন ডা. মিতুল। তিনি লিখেছেন, ‘একটা ইসিজি করাতে তিন ঘণ্টা লেগে যায় তাও আমি বলার পর। যাই হোক মর্নিং ডক্টরকে ইসিজি দেখালে তিনি বলেন ইসিজি খারাপ মনে হচ্ছে, রেফার লাগতে পারে। আমি এর মধ্যে ওয়ার্ড বয়কে বলে 1 amp lasix দেই। বাবার হার্ট ফেইলিওর ছিল। ইনডোর ডক্টরও এরমধ্যে চলে আসেন। ইসিজি দেখে লোডিং ডোজ দেয়।’
পরিচয় দেওয়ার পরও নার্সের অবহেলার বিবরণ দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি সিস্টারকে বলি ব্লাড প্রেসার চেক করতে। কিন্তু সিস্টার আমার কথা কানেই নিচ্ছিল না। তখন আমি তাকে বলতে থাকি আমি এখানকার ডেন্টাল সার্জন, আমার বাবা এখানেরই অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারী, ঠিক আছে আপনাদের কিছুই করতে হবে না, মেশিন দেন আমি নিজেই বিপি চেক করব। এরপর আমি বিপি চেক করি। কিন্তু রেকর্ড করতে পারছিলাম না, যেটা আমি ইনডোর ডাক্তারকে জানাই। পরবর্তীতে কেউই আর রিচেক করেনি।’
এ সময় সুস্থতা অনুভব করার পর রোগীকে বাসায় নেওয়া হয়। পরে সকাল ১১টার দিকে রাজশাহীতে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় এই চিকিৎসকের স্বজনরা। ডা. মিতুল লিখেছেন, ‘অ্যাম্বুলেন্সে যাওয়ার সময় আব্বু বিস্কুট খেলেন, পানি খেলেন, কথা বললেন, ঘুমালেন।
আনুমানিক দুপুর ১টার সময় হার্ট ফাউন্ডেশনে বাবাকে ভর্তি করাই। তাকে সিসিইউতে (করোনারি কেয়ার ইউনিট) নেয়া হয়। সিসইউতে তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন ভালো ছিল, তিনি সুস্থ ছিলেন। ৫-১০ মিনিট পর আমাকে ডেকে নেয়া হয় এবং বলা হয় রোগীকে তারা আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নিতে চায়, কারণ যেকোনো সময় তো খারাপ হতেও পারে।’
তিনি লিখেছেন, ‘রোগী যেহেতু ভালো আছে, আমি চাইনি তাকে আইসিইউতে দিতে। আমাকে আবারও ডাকা হয়, বলা হয় আইসিইউ ডক্টর কথা বলবে। তাদের ম্যানিপুলেশনে আমি রাজি হই। আইসিইউতে ট্রান্সফার করা হয়। বাবার কী অবস্থা আমি জানার জন্য বারবার নক করি। সিস্টার বারবার আমাকে বাধা দেয়, বলে পেশেন্ট রেডি করে ডাকা হবে।’
আনুমানিক বিকেল ৬টার দিকে তাকে ডাকা হয়। এ সময় চিকিৎসায় অবহেলার বিবরণ দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি দেখলাম 15L oxygen চলছে। spo2 98%. breathing pattern কিছুটা চেঞ্জ মনে হচ্ছে। আমি বলেছি, বারবার অনুরোধ করেছি, বাবা যেহেতু সিওপিডি পেশেন্ট সেহেতু low dose অক্সিজেন দিয়ে মেইনটেইন করেন। অনেক বলার পর একটা সময় ৪-৫ লিটারেও অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৮% মেইনটেইন হচ্ছিল আমাকে জানানো হয়। low dose অক্সিজেন দিয়ে স্যাচুরেশন মেন্টেন করতে পারলে high flow দিয়ে কেন বাবার রেস্পিরাটরি ড্রাইভটাকে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছিল?’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘তারপর MI-এর জন্য কী কী ঔষধ দেয়া হয়েছে জানতে চাওয়ায় বলেছিল anclog plus, rostab, Bislol, metacard, nidocard retard etc. কিন্তু সেখানে কোন inj. Enoxaperin বা inj. Streptokinase কেন দেওয়া হয়নি জানতে চাইলে কোন সদুত্তর দিতে পারেনি। তৎক্ষণাৎ ডিউটি ডাক্তারকে সিনিয়রের সাথে কথা বলে inj.enoxaparine দেওয়ানোর ব্যবস্থা করি। এরপর আমি বাইরে চলে আসি আর কেস সামারি রেডি করতে বলি। মানে এমন একটা জায়গায় বাবাকে নিয়ে গিয়েছিলাম যেখানে সবকিছু আমাকে বলে বলে করে নিতে হচ্ছিল। এত অদক্ষতা আর অব্যবস্থাপনার মধ্যে আর থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। আমাকে আর ঢুকতে দেয়া হয়নি।’
রাত আনুমানিক ১০ টার দিকে তাকে পুনরায় ডাকা হয় জানিয়ে ডা. মিতুল লিখেছেন, ‘ভিতরে গিয়ে দেখি বাবাকে intubate করা হয়েছে এবং আম্বু ব্যাগ চেপে কিছুটা রেস্পিরেশন মেন্টেন করা হচ্ছে। আমাকে বলা হয় পেশেন্টের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে। ডিসি শক ও সিপিআর দেয়া হয়। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে endotracheal tube দেয়া, কিন্তু ventilator machine কেন চালু করা হচ্ছে না। আমার কথায় তারা ventilation support চালু করে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল সেখানে কোন airflow হচ্ছে না। আমি অনুরোধ করেছি ventilator ঠিকমত কাজ করছে কিনা দেখার জন্য।’
‘চোখের সামনে দেখছিলাম বাবা মারা যাচ্ছেন’ উল্লেখ করে মিতুল লিখেছেন, ‘ঘটনার আকস্মিকতায় আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর ডক্টর, ওয়ার্ড বয়কে আবারও ভালোভাবে চেক করতে বলি যে ভেন্টিলেটর ঠিকমতো চলছে কিনা আমাকে দেখান। তারা আমাকে বলে যে ১০০% আছে। কিন্তু আমি বুঝেছি যে ভেন্টিলেটর চলছে না, এজন্য আমি তাদেরকে টিউব খুলে দেখাতে বলি। তারা কোনভাবেই খুলছিল না। আমি যখন খুলতে যাই তখন ওয়ার্ডবয় টিউব খুলে বলে যে ১০০% ফ্লো আছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি টিউবের মুখে হাত রেখে দেখেছি সেখানে airflow বলতে কিছুই ছিল না। আমাকে মিথ্যা বলা হচ্ছিল। বোকা বানানো হচ্ছিল। ওরা হয়তো ভেবেছিল আমি সেই মুহূর্তে কিছুই বুঝতে পারবো না। এভাবে আমার বাবাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা হয়েছে। এটা হত্যা, এটা ক্রাইম।’
কেন একটা অকেজো ভেন্টিলেটর দিয়ে আমাদের ধোকা দেয়া হচ্ছিল? আমি আমার মনকে কোনভাবেই বুঝাতে পারছি না। সারা জীবন এদের অভিশাপ দিয়ে গেলেও কি আমার পাপ হবে? আমার সাথে যা হয়েছে তা যেন তাদের জীবনেও কোন না কোন ভাবে ফিরে আসে সারা জীবন আমি এই দোয়া করে যাব— ডা. তানিয়া আফরিন মিতুল
পরবর্তীতে পুলিশে যোগাযোগ করেন ডা. মিতুল। তিনি লিখেছেন, ‘আমি পুলিশ কল করি এবং যারা সেখানে ছিলেন তাদের বলি আপনারা কেউ হাত রেখে দেখান যে সেখানে অক্সিজেন flow আছে কিনা। কেউ এগিয়ে আসেনি। সহকারী পরিচালক, যার নাকি কার্ডিওলজিতে কোন কোর্স করা আছে—তাকে বললাম যে আপনি জাস্ট হাত রেখে বলেন যে এয়ার ফ্লো আছে কিনা। তিনি বলেছেন, তিনি ভেন্টিলেটর মেশিন সম্পর্কে কোন জ্ঞান রাখেন না, তাই তিনি হাত দিতে পারবেন না। আমি পুনরায় ভেন্টিলেটর চালু করে দেখাতে বললে তারা কেউ চালু করতে পারেননি।
‘যদি ভেন্টিলেটর অকেজোই হয় আর অদক্ষ, অযোগ্য, অপদার্থ ডাক্তার দিয়ে আইসিইউ চালানো হয় তাহলে আমার বাবাকে আইসিইউতে নেয়া হল কেন? যখন তারা ভেন্টিলেটর মেশিন চালু করতে পারছিল না, তখন অন্য কোথাও রেফার করল না কেন? আমাকে জানানো হলো না কেন? কেন মেরে ফেলা হলো আমার বাবাকে? আমি এর বিচার চাই, সুষ্ঠু তদন্ত চাই’—লিখেছেন ডা. মিতুল।
রাজশাহীর হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে ডা. তানিয়া আফরিন মিতুল আরও লিখেছেন, ‘আইসিইউর মত একটা সেনসিটিভ জায়গায় কারা অপদার্থ ডাক্তারদের নিয়োগ দেয়? এদের কি আল্লাহর ভয় নেই? আইসিইউতে কেন আইসিইউ কনসালটেন্ট থাকবে না? সিওপিডি পেশেন্টের অক্সিজেন ম্যানেজমেন্ট কেন ঠিকমতো হলো না? ৫ ঘন্টাতেও আমার বাবা কেন একটা ব্লাড থিনার পেল না? আমি বলে না দিলে সেটাও পেতো না। কেন একটা অকেজো ভেন্টিলেটর দিয়ে আমাদের ধোকা দেয়া হচ্ছিল? আমি আমার মনকে কোনভাবেই বুঝাতে পারছি না। সারা জীবন এদের অভিশাপ দিয়ে গেলেও কি আমার পাপ হবে? আমার সাথে যা হয়েছে তা যেন তাদের জীবনেও কোন না কোন ভাবে ফিরে আসে সারা জীবন আমি এই দোয়া করে যাব।’