১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:২৩

৫ আগস্টের পর জুতার মালা পরে ক্যাম্পাসে ঘোরানো ছাত্রলীগ নেতা এখন ইউএইচএফপিও

কাশিয়ানি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রাহাত হোসেন  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও এর আগে শিক্ষার্থীদের ওপর নানা নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে ৫ আগস্টের পর জুতার মালা পরিয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাহাত হোসেনকে ক্যাম্পাসে প্রদক্ষিণ করেছিলেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে রাহাতকে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বদলিও করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেই ছাত্রলীগ নেতা এখন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও)। তবে সেখানেও অনিয়মের কারণে আবারও এসেছেন আলোচনায়।

রাহাত হোসেন বর্তমানে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলার ইউএইচএফপিও। গত ৩ আগস্ট এই পদে তাকে বদলি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের পক্ষে এই আদেশে সই করেছেন পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রূমী। এর আগে রাহাত হোসেন ভোলার তজুমুদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার পদে কর্মরত ছিলেন তিনি। সেখানে ইউএইচফিওর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাহাত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি এক পর্যায়ে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। পরে বিসিএসের মাধ্যমে এসএইচএসএমসি হাসপাতালের ‘সহকারী সার্জন/মেডিকেল অফিসার (রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং)’ পদে যোগদান করেন।

ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকাকালে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ ছিল। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত হন তিনি। ১৮ আগস্ট জুতার মালা পরিয়ে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে ঘোরান শিক্ষার্থীরা।

ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকার সময় ডা. রাহাতেরা বহু শিক্ষার্থীর ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ভিন্ন মতের অবস্থান তো দূরের কথা, তারা জুনিয়রদের ওপর ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করতেন। এজন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ফুঁসে ওঠে এবং তাকে জুতার মালা পরিয়ে ক্যাম্পাসে ঘোরানো হয়— ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, সহ-সভাপতি, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী

এ ছাড়া একই দিন রাহাত হোসেনকে বদলি করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অনুরোধ করেন তৎকালীন পরিচালক ডা. শফিউর রহমান। তৎকালীন স্বাস্থ্য ডিজি অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলমকে দেওয়া চিঠিতে এই অনুরোধ জানান তিনি। ওই চিঠিতে লেখা হয়, ডা. রাহাত হোসেন বিগত দিনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নানা অপকর্ম করেছেন। তার বিরুদ্ধে এই মেডিকেল কলেজের সকল শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন এবং সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত অথবা শাস্তিমূলক বদলির দাবি করছেন। এ অবস্থায় ডা. রাহাত হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত, বরখাস্ত অথবা শাস্তিমূলক বদলি করে হাসপাতালের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করছি।

এদিকে রবিবার কর্মস্থলে রাহাত হোসেনের অনুপস্থিতির একটি লাইভ সংবাদ প্রতিবেদন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তার ইউএইচএফপিও পদে নিয়োগের তথ্য জানতে পারেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা। এতে উষ্মা প্রকাশ করেছেন তারা। বলছেন, ৫ আগস্টের আগে শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়নের সাথে জড়িত এমন একজন ছাত্রলীগ নেতাকে এভাবে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ দেওয়া বিস্ময়কর।

তারা বলছেন, রাহাত হোসেন মূলত ঢাকায় ফিরে আসার পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়েছে। দেখা যাচ্ছে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে আবারও ঢাকার পাশে তার পোস্টিং হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাধা, হুমকি, হামলা, নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তাসহ নানা কারণে ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা তাকে অপদস্থ করে ক্যাম্পাস ছাড়া করে। অথচ তলে তলে তাকে ইউএইচএফপিও বানানো হয়েছে। আর আমরা আবারও অনিয়মের কারণে সেটা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারছি। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই— ডা. যায়েদ আহমাদ, কেন্দ্রীয় স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক, ইসলামী ছাত্রশিবির ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের সাবেক শিক্ষার্থী

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ছাত্রলীগের নেতৃত্বে থাকার সময় ডা. রাহাতেরা বহু শিক্ষার্থীর ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ভিন্ন মতের অবস্থান তো দূরের কথা, তারা জুনিয়রদের ওপর ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করতেন। এজন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ফুঁসে ওঠে এবং তাকে জুতার মালা পরিয়ে ক্যাম্পাসে ঘোরানো হয়।

তিনি বলেন, রাহাত এখন ইউএইচএফপিও পদে, এটা শুনে অবাক হয়েছি। এভাবে খোঁজ না নিয়ে যে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

একই মেডিকেলের আরেক সাবেক শিক্ষার্থী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক ডা. যায়েদ আহমাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, রাহাত হোসেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা। এই মেডিকেলে সব ধরনের নিপীড়নের ঘটনার আশ্রয়দাতা তিনি।

যায়েদ আহমদা বলেন, ২০২২ সালের ১৩ আগস্ট সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ছেলেদের হল থেকে ২০ জনকে পিটিয়ে বের করে দেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনা ছাড়াও আরও বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থী নিপীড়নে জড়িত ছিল সংগঠনটি। এসব ঘটনার অন্যতম প্রশ্রয়দাতা রাহাত হোসেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাধা, হুমকি, হামলা, নারী শিক্ষার্থীদের হেনস্তাসহ নানা কারণে ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীরা তাকে অপদস্থ করে ক্যাম্পাস ছাড়া করে। অথচ তলে তলে তাকে ইউএইচএফপিও বানানো হয়েছে। আর আমরা আবারও অনিয়মের কারণে সেটা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারছি। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।