১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:২৯

দেশে বাতরোগে আক্রান্ত ৩০ শতাংশ মানুষ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় নিঃস্ব বহু পরিবার

পিএনআরএফআরের প্রথম বৈজ্ঞানিক সম্মেলন  © সংগৃহীত

বাংলাদেশে বাতরোগ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলায় এর চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বহু পরিবার। একদিকে ধারাবাহিক চিকিৎসার বিপুল খরচ, অন্যদিকে আক্রান্ত ব্যক্তির কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশের অনেক পরিবার ‘ক্রমাগত দারিদ্র্যের’ মুখে পড়ছে। অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকির তালিকায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব সৃষ্টিকারী এই রোগটি এখনো জাতীয় নীতিমালায় উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্ট আয়োজিত ‘১০ম রোগী শিক্ষা কার্যক্রম ও ১ম বৈজ্ঞানিক সম্মেলন’-এ বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য ও উদ্বেগ তুলে ধরেন।

সম্মেলনে উপস্থাপিত বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ৩০.৪ শতাংশ মানুষ বাতরোগে আক্রান্ত। এদের মধ্যে ২৪.৮ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন এবং ২৪.৪ শতাংশ বছরের কোনো না কোনো সময় কাজের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এ ছাড়া দেশে অস্টিওপোরোসিসের প্রাদুর্ভাব ১৬.৭ শতাংশ (প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ মানুষ) এবং ২০২৬ সাল নাগাদ ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব নারীদের ৪০ শতাংশই (প্রায় ৬৫.৬ লাখ) এতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ অসংক্রামক ব্যাধিতে হলেও এর মধ্যে বাতরোগ অবহেলিত।

সম্মেলনে পিএনআরএফআর ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. নীরা ফেরদৌস মূল প্রবন্ধে জানান, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে বছরে ৪০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা এবং স্পন্ডাইলোআর্থ্রাইটিসে ৪০ হাজার থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এ ছাড়া হাঁটু প্রতিস্থাপনে দেড় লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা এবং হিপ ফ্র্যাকচারের অস্ত্রোপচারে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়, যা সাধারণ পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।

পিএনআরএফআর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও বাতব্যথা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সঠিক সময়ে নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে বহু রোগী স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করছেন। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে বিশেষজ্ঞ রিউম্যাটোলজিস্টের সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত।

তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যথেচ্ছ ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার বিষয়ে কঠোর সতর্কতা দিয়ে বলেন, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো এই রোগকেও দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তিনি সুস্থ জীবনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম ও সময়মতো ভ্যাকসিনের ওপর জোর দেন। পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থার সাথে সাথে বড় পরিসরে বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

পিএনআরএফআর ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত দুস্থ রোগীদের ১ কোটি টাকারও বেশি সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান বক্তারা। অনুষ্ঠানে রোগীদের সুবিধার্থে ‘সাপোর্ট সেন্টার বুথ’ স্থাপন এবং বিশেষ ‘সার্ভিস কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘রিউমাটোলজি ইনস্টিটিউট’ গড়ে তোলার লক্ষ্য ব্যক্ত করে ট্রাস্টটি।

দিনব্যাপী এই সম্মেলনে সারাদেশে থেকে আসা আট শতাধিক বাত ব্যথার রোগী অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বিএমইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, বিএমডিসি কাউন্সিলর অধ্যাপক ডা. মো. মাহমুদ হোসেনসহ স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।