১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৯

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা: স্বাস্থ্য বিভাগ

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা: স্বাস্থ্য বিভাগ  © সংগৃহীত

ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু। রাজধানীর তুলনায় এবার ঢাকার বাইরে আক্রান্তের হার বেশি। আগামী এক মাসের মধ্যে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। একই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও। পরিস্থিতি সামাল দিতে চিকিৎসাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যারা এর আগে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, এবার তাদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রথমবার আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর পাশাপাশি সারাদেশেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীদের ঢাকার হাসপাতালে আনা হচ্ছে। ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগীদের পর্যাপ্তভাবে ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না বলেও জানা গেছে।

এদিকে দেশে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের প্রাদুর্ভাবও চলছে। দুই রোগের চাপ একসঙ্গে পড়ায় চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ব্যাপক চাপের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯০ জন। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ১১১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

সরেজমিনে রাজধানীর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দেখা গেছে, জরুরি বিভাগে ডেঙ্গু ও হামে আক্রান্ত রোগীর চাপ বেড়েছে। অনেক হাসপাতালেই রোগী ভর্তির জন্য পর্যাপ্ত শয্যা নেই। গুরুতর অবস্থায় থাকা রোগীদের অনেকেরই আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হলেও সংকট রয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে সম্পৃক্ত করে পাড়া-মহল্লায় মশক নিধনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

নিপসমের কিটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার বলেন, এ বছর ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি হচ্ছে। সময়মতো এডিস মশা নিধন এবং স্থায়ী ব্যবস্থাপনা গ্রহণ না করায় রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এডিস মশা ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, আগে এডিস মশার বংশবিস্তার মূলত সিটি করপোরেশনকেন্দ্রিক ছিল। তখন উৎসস্থলগুলো নির্মূল করা গেলে ঢাকার বাইরে এর বিস্তার অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব হতো। কিন্তু ঢাকার বাইরে উপজেলা ও পৌরসভাগুলোও মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও জনগণকে মশক নিধন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা গেলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও আলাদা ডেঙ্গু কর্নার চালু করা প্রয়োজন। একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুনরায় সংক্রমিত হলে ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা ও খাবারে অরুচির মতো উপসর্গ দেখা দিলে ডেঙ্গুর এনএস-১ পরীক্ষা করানো যেতে পারে। পরীক্ষায় পজিটিভ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারের রোগীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে প্রথমে রোগীর রক্তচাপ স্বাভাবিক আছে কি না, তা দেখতে হবে। রক্তচাপ কমে গেলে বা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। তবে শুধু আইসিইউ বা হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য অযথা ছোটাছুটি করার প্রয়োজন নেই। ডেঙ্গু ও হামের অনেক রোগীর চিকিৎসা হাসপাতালের বহির্বিভাগেও দেওয়া সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, হামের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসছে এবং মৃত্যুর হারও কমেছে। তবে হামের পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব চিকিৎসাসেবায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, যারা আগে একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ঝুঁকি বেশি। তবে প্রথমবার আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন।

এ বছর গ্রামাঞ্চল তথা ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্বিগ্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত মশক নিধন কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাব্যবস্থা দ্রুত ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি মশক নিধন কার্যক্রম জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।