০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৮

কুকুর কামড়ানোর পর করণীয় কী, কত ঘণ্টার মধ্যে জলাতঙ্কের টিকা নিতে হয়?

কুকুরের কামর   © সংগৃহীত

কুকুরের কামড়ের পর অনেকেই ভাবেন, কয়েক ঘণ্টা বা এক-দুই দিন অপেক্ষা করে জলাতঙ্কের টিকা নিলেও হবে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এমন অপেক্ষা বিপজ্জনক হতে পারে। কুকুর কামড়ানো বা আঁচড় দেওয়ার পর ক্ষত দ্রুত পরিষ্কার করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে। সম্ভাব্য জলাতঙ্কের সংস্পর্শে এলে নির্দিষ্ট ২৪ ঘণ্টার সময়সীমার মধ্যে টিকা নিতেই হবে—এমন কোনো কঠোর নিয়ম নেই; বরং যত দ্রুত সম্ভব পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা পিইপি শুরু করাই গুরুত্বপূর্ণ।

গত কয়েক বছরে কুকুরের কামড়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কুকুরের কামড় বিভিন্ন কারণে বিপজ্জনক হতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো ক্ষতস্থানে সংক্রমণের আশঙ্কা এবং বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি কুকুরের কামড় থেকে জলাতঙ্ক, সেপসিস ও মেনিনজাইটিসের মতো গুরুতর এবং প্রাণঘাতী রোগও হতে পারে, বিশেষ করে সময়মতো চিকিৎসা না নিলে। কুকুরের কামড়ের সবচেয়ে গুরুতর জটিলতাগুলোর একটি হলো জলাতঙ্ক।

জলাতঙ্ক র‍্যাবিস ভাইরাসের কারণে হওয়া একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত মানুষসহ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আক্রান্ত করে। সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর লালা কামড়, আঁচড় বা ক্ষতস্থানের সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ভাইরাসটি প্রবেশ করে। শরীরে প্রবেশের পর ভাইরাসটি স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা না হলে প্রাণঘাতী হতে পারে।

জলাতঙ্কের উপসর্গ সাধারণত সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় না। এ জন্য অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। পরে জ্বর, বিভ্রান্তি, অস্থিরতা, হ্যালুসিনেশন, শরীরের বিভিন্ন অংশ অবশ হয়ে যাওয়া বা পক্ষাঘাতের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ভাইরাসটি মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে ক্লিনিক্যাল উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর জলাতঙ্ক প্রায় ১০০ শতাংশ প্রাণঘাতী। তবে উপসর্গ শুরুর আগেই যথাযথ পিইপি নিলে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

কখন টিকা নিতে হবে?

কুকুর কামড়ালে জলাতঙ্কের উপসর্গ দেখা দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না। সম্ভাব্য জলাতঙ্কের সংস্পর্শে এলে যত দ্রুত সম্ভব, অর্থাৎ কোনো ধরনের অযথা দেরি না করে পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা পিইপি শুরু করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সম্ভাব্য জলাতঙ্কের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

অনেকে মনে করেন, কুকুর কামড়ানোর পর কয়েক দিন অপেক্ষা করে উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা শুরু করলেই হবে। এটি ভুল ধারণা। জলাতঙ্কের টিকা ভাইরাসকে স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছানোর আগেই প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। তাই উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। ক্লিনিক্যাল উপসর্গ শুরু হয়ে গেলে টিকা আর রোগ প্রতিরোধ করতে পারে না।

অ্যান্টি-র‍্যাবিস ভ্যাকসিন (এআরভি)

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে একাধিক ডোজে দেওয়া হয়। টিকা কতটি ডোজ এবং কোন দিন দিতে হবে, তা রোগীর আগে জলাতঙ্কের টিকা নেওয়ার ইতিহাস, কামড় বা আঁচড়ের ধরন এবং ব্যবহৃত টিকা দেওয়ার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। WHO একাধিক অনুমোদিত পদ্ধতি ও সময়সূচি নির্ধারণ করেছে। তাই নিজের মতো করে কোনো ডোজ বাদ দেওয়া বা টিকার সময়সূচি পরিবর্তন করা উচিত নয়।

র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আরআইজি)

গভীর বা ত্বক ভেদ করে হওয়া একাধিক বা একক কামড় কিংবা আঁচড়, ভাঙা ত্বকে আক্রান্ত প্রাণীর লালা লাগার মতো গুরুতর সংস্পর্শের ক্ষেত্রে চিকিৎসক র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন দিতে পারেন। WHO-এর তৃতীয় শ্রেণির বা গুরুতর সংস্পর্শের ক্ষেত্রে টিকার পাশাপাশি র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন দেওয়ার পরামর্শ রয়েছে। এটি মূলত ক্ষতের ভেতরে ও আশপাশে প্রয়োগ করা হয়, যাতে টিকা শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করার আগেই অতিরিক্ত সুরক্ষা পাওয়া যায়।

টিটেনাস টিকা

কুকুরের কামড়ের ক্ষতের ক্ষেত্রে টিটেনাস প্রতিরোধের প্রয়োজন হতে পারে। শেষবার টিটেনাসের টিকা কখন নেওয়া হয়েছিল এবং ক্ষতের ধরন কেমন—এসব বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

অ্যান্টিবায়োটিক

কুকুরের কামড়ের ক্ষতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। তবে সবার ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। ক্ষতের ধরন, অবস্থান ও সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

কুকুর কামড়ালে তাৎক্ষণিকভাবে যা করবেন

কুকুর কামড়ালে বা আঁচড় দিলে দ্রুত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব পদক্ষেপ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেই করা উচিত।

প্রবাহমান পানিতে ক্ষত ভালোভাবে ধুয়ে নিন

কামড় বা আঁচড়ের জায়গাটি সঙ্গে সঙ্গে সাবান ও প্রচুর প্রবাহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। সাবান না থাকলেও শুধু প্রচুর পানি দিয়ে ক্ষতটি ভালোভাবে ধুতে হবে। ক্ষত ধোয়ার এই প্রক্রিয়া জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোর একটি।

ক্ষত ধোয়ার সময় জোরে ঘষাঘষি করে নতুন করে ক্ষত তৈরি করা যাবে না। প্রচুর পানি দিয়ে জায়গাটি ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। যত দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার করা যায়, ততই ভালো।

জীবাণুনাশক ব্যবহার করুন

ক্ষত ভালোভাবে ধোয়ার পর আয়োডিনযুক্ত জীবাণুনাশক, যেমন পোভিডোন-আয়োডিন, ব্যবহার করা যেতে পারে। WHO ক্ষত পরিষ্কারের পর আয়োডিনযুক্ত বা র‍্যাবিস ভাইরাস নিষ্ক্রিয় করতে পারে—এমন জীবাণুনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে।

ক্ষতে মরিচের গুঁড়া, গাছের রস, অ্যাসিড বা ক্ষারজাতীয় কোনো পদার্থ দেওয়া উচিত নয়। এসব পদার্থ ক্ষতের আরও ক্ষতি করতে পারে।

রক্তপাত বন্ধ করুন

কামড়ের জায়গা থেকে রক্ত পড়লে পরিষ্কার কাপড় বা গজ দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করুন। রক্তপাত বেশি হলে বা কয়েক মিনিট চাপ দেওয়ার পরও বন্ধ না হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

ক্ষত শক্তভাবে ঢেকে বা নিজে থেকে সেলাই করবেন না

ক্ষত শক্ত করে ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখা বা নিজে থেকে সেলাই করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক ক্ষত পরিষ্কার করে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পর সেলাই করবেন। WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, সেলাই প্রয়োজন হলে আগে ক্ষতের ভেতরে র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রয়োগ করে এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সেলাই করতে হয়।

দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান

প্রাথমিকভাবে ক্ষত পরিষ্কার করার পর দ্রুত হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে। চিকিৎসক ক্ষতের ধরন, কামড়ের স্থান, প্রাণীটির অবস্থা ও জলাতঙ্কের ঝুঁকি মূল্যায়ন করে পোস্ট-এক্সপোজার প্রোফাইল্যাক্সিস বা পিইপি শুরু করবেন। প্রয়োজন হলে জলাতঙ্কের টিকা এবং গুরুতর সংস্পর্শের ক্ষেত্রে র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন দেওয়া হবে।

WHO অনুযায়ী, সম্ভাব্য জলাতঙ্কের সংস্পর্শকে সাধারণত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। শুধু প্রাণী স্পর্শ করা বা অক্ষত ত্বকে লালা লাগলে সাধারণত পিইপি প্রয়োজন হয় না। ত্বকে সামান্য আঁচড় বা রক্তপাত না হওয়া ক্ষত হলে তাৎক্ষণিক টিকা প্রয়োজন হতে পারে। আর ত্বক ভেদ করে কামড় বা আঁচড়, ভাঙা ত্বকে লালা লাগা কিংবা মিউকাস মেমব্রেনে লালা লাগার মতো গুরুতর সংস্পর্শে ক্ষত পরিষ্কারের পাশাপাশি দ্রুত টিকা এবং র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রয়োজন হতে পারে।

যেসব বিষয় মনে রাখবেন

কুকুর কামড়ালে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই ক্ষতটি সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট পরিষ্কার করতে হবে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।

চিকিৎসক যে চিকিৎসা ও টিকার সময়সূচি দেবেন, তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। নিজের সিদ্ধান্তে টিকার কোনো ডোজ বাদ দেওয়া বা চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়।

খালি হাতে ক্ষত স্পর্শ করা উচিত নয়। ক্ষত ঢেকে রাখার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

কামড়ের পর জলাতঙ্কের টিকা নেওয়া কোনোভাবেই অযথা বিলম্ব করা যাবে না। WHO বলছে, সম্ভাব্য জলাতঙ্কের সংস্পর্শে এলে দ্রুত পিইপি নেওয়া এবং যথাযথভাবে ক্ষত পরিষ্কার করা রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।

এ ছাড়া ক্ষতস্থানে সংক্রমণের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। ক্ষতস্থানে লালচে ভাব বাড়া, ফুলে যাওয়া, অতিরিক্ত ব্যথা বা পুঁজ বের হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কুকুর কামড়ানোর পর জলাতঙ্কের উপসর্গ দেখা দেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না। ক্ষতটি সঙ্গে সঙ্গে সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে। কারণ জলাতঙ্কের ক্লিনিক্যাল উপসর্গ শুরু হয়ে গেলে রোগটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই প্রাণঘাতী। অন্যদিকে, উপসর্গ শুরুর আগেই যথাযথ পোস্ট-এক্সপোজার চিকিৎসা নিলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা সম্ভব।