পায়ুপথে কফি প্রয়োগের অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচার করছেন চিকিৎসকরা!
‘কফি অ্যানেমা’ নামে এক ধরনের বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচার ও ব্যবহার নিয়ে চিকিৎসাঙ্গনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। একদল চিকিৎসকের দাবি, নলের মাধ্যমে বিশেষ পদ্ধতিতে পায়ুপথে উষ্ণ কফি প্রবেশ করিয়ে লিভার বিষমুক্ত করা যায়। তবে পরিপাকতন্ত্র ও লিভার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তো নয়ই, বরং মৃত্যুর কারণও হতে পারে এই চর্চা। একই সাথে খোদ চিকিৎসকদের প্রচারণার কারণে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও দেখছেন তারা।
মূলত মলাশয় বা কোলন পরিষ্কারের একটি বিকল্প প্রক্রিয়া হিসেবে ‘কফি অ্যানেমা’র উদ্ভব। এতে রেকটাম বা পায়ুপথের মাধ্যমে শরীরে প্রক্রিয়াজাত কফি ও পানির মিশ্রণ প্রবেশ করানো হয়। প্রচারকদের দাবি, এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করে দেওয়া বা ‘ডিটক্সিফিকেশন’-এর কাজ করে।
সম্প্রতি ‘ওষুধবিহীন বিকল্প লাইফস্টাইলের প্রচারক’ হিসেবে পরিচিত ডা. জাহাঙ্গীর কবিরসহ বেশ কয়েকজন চিকিৎসক কফি অ্যানেমার বিস্তারে ব্যাপক সোচ্চার হয়েছেন। মূলত, তার হাত ধরেই দেশে এই পদ্ধতি এক রকম ‘ভাইরাল’ হয়েছে। এর প্রচারে আরও রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশি চিকিৎসক প্রফেসর ডা. মুজিবুল হক এবং বিদেশে অবস্থানরত আরেক বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. মুজিবুর রহমান। সম্প্রতি নিরাপদ সড়ক চাই-নিসচার চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে সঙ্গে নিয়ে কফি অ্যানেমা বিষয় একটি ভিডিও প্রচার করেন প্রফেসর মুজিবুল হক।
এসব চিকিৎসকের দাবি, কফি অ্যানেমা মলদ্বার দিয়ে প্রবেশ করালে কফিতে থাকা ক্যাফেইন এবং থিওফিলিন অন্ত্রের শিরা হয়ে সরাসরি লিভারে পৌঁছায় এবং সেখানে ‘গ্লুটাথিয়ন এস-ট্রান্সফারেজ’ বা জিএসটি নামক ডিটক্স এনজাইমের উৎপাদন প্রায় ৭০০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়, যা লিভার ও রক্তকে দ্রুত বিষমুক্ত বা ডিটক্স করে।
অনেকে দাবি করেন এটি লিভার পরিষ্কার করে বা বিষাক্ত পদার্থ শরীর থেকে বের করে দেয়। অথচ মানবদেহে লিভার ও কিডনি প্রাকৃতিকভাবেই ২৪ ঘণ্টা ডিটক্সিফিকেশনের কাজ সম্পাদন করে। মলদ্বার দিয়ে কফি ঢোকানের মাধ্যমে ‘ডিটক্স’ করার মতো অবৈজ্ঞানিক ধারণার কোনো ফিজিওলজিক্যাল যৌক্তিকতা নেই— ডা. মো. আরিফুর রহমান, কনসালট্যান্ট, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল
তারা আরও দাবি করেন, এই পদ্ধতিটি কোলন বা মলাশয়ে জমে থাকা পুরোনো বর্জ্য ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করে হজমশক্তি বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, শরীরের মেদ ও ওজন কমায়, ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সাহায্য করে এবং সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও এনার্জি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তবে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট বা পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, কফি অ্যানেমায় কোনো উপকার তো নেই-ই, এটি পায়ুপথ ও পরিপাকতন্ত্রের ভয়াবহ ক্ষতি করে। একই সাথে মৃত্যুর কারণও হতে পারে এটি। কফি অ্যানেমা ব্যবহারে মৃত্যুর বৈশ্বিক রেকর্ড থাকার কথাও বলছেন তারা।
এ ছাড়া ‘বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি’ বলা হলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এর প্রচারে জড়িতরা দেশে স্বীকৃত বিকল্প পদ্ধতি তথা হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক কিংবা ইউনানী চিকিৎসক নন, তারা প্রমাণভিত্তিক অ্যালোপ্যাথি পদ্ধতির ডিগ্রিধারী। একই সাথে হোমিও, আয়ুর্বেদিক কিংবা ইউনানীতেও কফি অ্যানেমার মতো বিপজ্জনক ‘বিকল্প পদ্ধতি’র অস্তিত্ব নেই।
লিভার, পরিপাকতন্ত্র ও অগ্ন্যাশয় রোগ এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. মো. আরিফুর রহমান বলেন, কফি অ্যানেমা দ্বারা উপকারের কোনো বৈজ্ঞানিক ও গবেষণালব্ধ প্রমাণ নেই। মূলধারার চিকিৎসা বিজ্ঞানে কফি অ্যানেমার কোনো স্থান নেই।
কফি অ্যানেমার অকার্যকারিতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেকে দাবি করেন এটি লিভার পরিষ্কার করে বা বিষাক্ত পদার্থ শরীর থেকে বের করে দেয়। অথচ মানবদেহে লিভার ও কিডনি প্রাকৃতিকভাবেই ২৪ ঘণ্টা ডিটক্সিফিকেশনের কাজ সম্পাদন করে। মলদ্বার দিয়ে কফি ঢোকানের মাধ্যমে ‘ডিটক্স’ করার মতো অবৈজ্ঞানিক ধারণার কোনো ফিজিওলজিক্যাল যৌক্তিকতা নেই।
কফি অ্যানেমা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া উল্লেখ করে ডা. মো. আরিফুর রহমান বলেন, এর ফলে মানবদেহে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন কফির গরম দ্রবণ মলদ্বারের ভেতরের অত্যন্ত সংবেদনশীল মিউকোসা স্তরে ভয়াবহ বার্ন বা পোড়া ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। একই সাথে নলের সাহায্যে জোরপূর্বক দ্রবণ প্রবেশ করানোর সময় কোলন বা মলদ্বার ফুটো হয়ে যেতে পারে, যা অত্যন্ত জীবনঘাতী। এ ছাড়া এতে ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। বারবার অ্যানেমা দিলে শরীরের প্রয়োজনীয় সোডিয়াম, পটাশিয়াম ইত্যাদি খনিজ পদার্থ মারাত্মকভাবে কমে যায়। পটাশিয়ামের মাত্রা হঠাৎ কমে গেলে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট পর্যন্ত হতে পারে।
আমরা সব সময় এটা বলেই আসি যে চিকিৎসকদের নৈতিকতা ঠিক রেখে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসাসেবা পরিচালনা যদি অনৈতিকতার মধ্যে পড়ে, তবে সেটা প্রমাণ সাপেক্ষে অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ— ডা. মো. লিয়াকত হোসেন, রেজিস্ট্রার, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)
ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, অনিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত নয় এমন দ্রবণ ব্যবহারে রক্তে বিষ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে কফি অ্যানেমার ফলে ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা এবং অভ্যন্তরীণ সংক্রমণের কারণে রোগীর মৃত্যুর সুস্পষ্ট রেকর্ড রয়েছে।
কফি অ্যানেমার প্রচারণার প্রতিক্রিয়ায় এটি যৌন বিকৃতি হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন বেশ কয়েকজন চিকিৎসক। তবে ডা. আরিফুর রহমান বিষয়টিকে এভাবে দেখতে চান না। তিনি বলেন, এটি অল্টারনেটিভ মেডিসিন বা কুচিকিৎসার অংশ হিসেবেই ছড়ানো হয়েছে। ফলে একে যৌনাচার হিসেবে চিহ্নিত করে মূল সমস্যা থেকে নজর সরিয়ে দেওয়া মোটেও কাম্য নয়।
ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রিয়াজ উদ্দিন দানেশ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অনেকেই হোম ট্রিটমেন্টের মতো করে কফি অ্যানেমা ব্যবহার করেন। কিন্তু এটার কোনো সায়েন্টিফিক এভিডেন্স নাই। বরঞ্চ এটা উল্টা দেখা গেছে যে এটা হার্মফুল।
ডা. রিয়াজ উদ্দিন দানেশ জানান, সম্প্রতি কফি অ্যানেমার ফলে বিভিন্ন ক্ষত নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন। এর মধ্যে পরিপাকতন্ত্র পুড়ে যাওয়া, রক্তক্ষরণ, মলাশয় ফুটো হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন ক্ষত রয়েছে। তিনি জানান, কয়েকদিন আগেই রাজধানীর জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একজন রোগী আসেন, যার পায়খানার রাস্তায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল, বন্ধই হচ্ছে না। পরবর্তীতে চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে দেখলেন যে ভেতরে পুরা পুড়ে এবং কেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। পরে জানা গেল যে উনি ওই কফি অ্যানেমা নিচ্ছিলেন। উনি খুব সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে এসেছিলেন।
এই পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞ বলেন, আপনি একটা একটা ওষুধ কখন খাবেন? যখন আপনার জীবনে কোনো বেনিফিট হওয়ার চান্স বেশি থাকবে। প্রত্যেক ওষুধেরই একটা সাইড ইফেক্ট থাকতে পারে। কিন্তু আমরা দেখি বেনিফিটটা বেশি কিনা। বেনিফিটের চাইতে ক্ষতির দিক যদি বেশি হয়, তাহলে সাধারণ বিবেকই বলে এটা আসলে একসেপ্ট করা যায় না।
দেশে চিকিৎসা চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। বিএমডিসি আইন, ২০১০-এ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ওষুধ প্রেসক্রাইব করার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। আর ওষুধ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) কাছে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কফি অ্যানেমা দেশে নতুন আবির্ভূত হওয়ায় ওষুধ হিসেবে গণ্যও হয়নি, নিষিদ্ধও নয়। ফলে এ নিয়ে বিএমডিসির করণীয় কিছু নেই।
আপনি একটা একটা ওষুধ কখন খাবেন? যখন আপনার জীবনে কোনো বেনিফিট হওয়ার চান্স বেশি থাকবে। প্রত্যেক ওষুধেরই একটা সাইড ইফেক্ট থাকতে পারে। কিন্তু আমরা দেখি বেনিফিটটা বেশি কিনা। বেনিফিটের চাইতে ক্ষতির দিক যদি বেশি হয়, তাহলে সাধারণ বিবেকই বলে এটা আসলে একসেপ্ট করা যায় না— ডা. রিয়াজ উদ্দিন দানেশ, সহকারী অধ্যাপক, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার ডা. মো. লিয়াকত হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এই ধরনের চর্চা আগে কখনো ছিল না। ইদানিং কিছু কিছু চিকিৎসকের বরাত দিয়ে সামনে আসছে। কাজেই, যারা এক্সপার্ট গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট, তারা যে কথাটি বলেছে যে এটা একেবারেই অবৈজ্ঞানিক, আমাদেরও সেই বক্তব্য।
তিনি বলেন, স্পেসিফিক একটি ইস্যুতে বিএমডিসি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। তবে আমরা সব সময় এটা বলেই আসি যে চিকিৎসকদের নৈতিকতা ঠিক রেখে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসাসেবা পরিচালনা যদি অনৈতিকতার মধ্যে পড়ে, তবে সেটা প্রমাণ সাপেক্ষে অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বক্তব্য জানতে চেষ্টা করেও ডা. জাহাঙ্গীর কবির ও অধ্যাপক ডা. মুজিবুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। মুঠোফোনে তাদের টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।