২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৭:০৭

কান্না করায় সন্তানকে হত্যাচেষ্টা বাবার, ৭০০ টাকা নিয়ে ঢামেকে আইসিইউর সামনে কাঁদছেন মা

ঢামেক হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুটি—নিচে তার বাবা হৃদয় খান ও পাশে চিকিৎসাধীন শিশুটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন  © টিডিসি সম্পাদিত

বয়স দুই মাস চলছে ফুটফুটে কন্যা শিশুটির। নাম সাবিহা ইসলাম রোজা। কান্না ছাড়া কোনো অনুভূতি প্রকাশের বয়স হয়নি তার। কিন্তু এই অপরাধেই পাষণ্ড বাবার হত্যাচেষ্টার শিকার মেয়েটি। গুরুতর আঘাত নিয়ে বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পি‌আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে সে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটির অবস্থা গুরুতর।

শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে শিশু রোজাকে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ক্যাজুয়াল্টিতে নিয়ে আসেন মা লাবণী জান্নাত। সঙ্গে ছিল মাত্র ৭০০ টাকা। শিশুটির অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে পিআইসিইউতে পাঠানো হয়। কিন্তু নাড়ি-ছেঁড়া ধনের মুমূর্ষু অবস্থায় পাশে নেই কোনো আত্মীয়-স্বজন। স্বামী হৃদয় খান হত্যাচেষ্টার পর গা ঢাকা দিয়েছেন। এ অবস্থায় শিশুটির চিকিৎসা নিশ্চিতে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন লাবণী।

লাবণী জান্নাতের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে একসঙ্গে ঘুমিয়েছিলেন তিনজনে। শনিবার ভোর ৪টার দিকেও শিশুটিকে ভালো অবস্থায় দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সকাল সাতটার দিকে ঘুম ভেঙে দেখেন তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন। গলায় ছিল কালচে দাগ। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে স্বামীকে আর দেখতে পাননি তিনি।

হৃদয় খান ও লাবণী দম্পতি রাজধানীর মিরপুর ১-এর মাজার রোডে থাকেন। হৃদয় আগে একটি বিরিয়ানির দোকানে কাজ করলেও বর্তমানে বেকার। আর অনলাইনে একটি এজেন্সিতে চাকরি করে সংসার চালান লাবণী।

প্রেমের সম্পর্ক হওয়ায় হৃদয় খানের পরিবার এখনও তাদের বিয়ে মেনে নেয়নি। আর নিজের বাবা-মা বেঁচে না থাকায় মেয়ের বিপদে এখন একাই লড়তে হচ্ছে লাবণীকে। এছাড়া হৃদয় খান পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও সন্দেহ করেন তিনি।

লাবণী আক্তার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হৃদয় আগে এরকম ছিল না। রোজা গর্ভে থাকার সময়ও সে অন্য শিশুদের আদর করত। কিন্তু তার জন্মের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সব কিছু বদলে যেতে থাকে। একদিন কান্না করায় ব্যাপক মারধর করে রোজাকে। পরে মাফ চায় যে আর এরকম করবে না। কিন্তু প্রায়ই কান্না করলে রেগে যেত।

মায়ের সঙ্গে শিশু রোজা

তিনি বলেন, শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি হৃদয় নাই। আর আমার মেয়েটার শরীরের সবখানে আঘাতের চিহ্ন। আমি এখনও মামলা করার কথা চিন্তা করতে পারিনি। আগে মেয়েটাকে বাঁচাই। কিন্তু আমার কাছে কোনো টাকা নাই। ডাক্তাররা আমাকে তিন হাজার টাকা দিয়েছে। ওটা দিয়েই ওষুধ আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হচ্ছে।

লাবণী আক্তারের অভিযোগ, মেয়েকে হাসপাতালে নেওয়ার পর বাসার মালিকের মাধ্যমে ঘটনা জানতে পারে তার শ্বশুর পরিবার। পরে তাকে মুঠোফোনে কল দিয়ে দেড় হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে মামলা না করার জন্য চাপ দেওয়া হয়।

ক্যাজুয়াল্টি বিভাগ ও শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট, জ্ঞানের মাত্রা কম ও সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। হাত কিংবা বালিশ চাপা দিয়ে তার নিশ্বাস বন্ধ করার চেষ্টা করেও থাকতে পারে।

শনিবার রাতে তারা জানান, রোগীর মা মাত্র ৭০০ টাকা নিয়ে হাসপাতালে আসেন। এ অবস্থায় চিকিৎসকদের মধ্য থেকেই প্রথমে ৩ হাজার টাকা শিশুর মায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে প্রয়োজনীয় খরচের জন্য আরও ৫ হাজার টাকা বিভাগে জমা রাখা হয়। কিন্তু এরকম পরিস্থিতিতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয়, যা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া রোগীর মা ছাড়া আর কেউ না থাকায় তার চিকিৎসা বেশ ব্যাহত হচ্ছে।

রবিবার দুপুরে আবারও খোঁজ নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। তবে এখনও শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না। আর ডিপার্টমেন্ট ফান্ড এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে মোট ১৫ হাজার টাকা জমা হয়েছে।

এ বিষয়ে রবিবার দুপুরে ঢামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামানকে জানানো হলে তিনি শিশুটির চিকিৎসার উদ্যোগ নেন। পরিচালক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিশুটির প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য আমি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বলেছি। একই সঙ্গে তার চিকিৎসার প্রয়োজনীয় খরচের ব্যবস্থাও আমরা করব।

সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত হৃদয় খানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে।