১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৩০

মুগদা মেডিকেলে চিকিৎসকদের কর্মবিরতি গড়াল তৃতীয় দিনে

হাসপাতাল প্রশাসনের সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা  © সংগৃহীত

ক্যান্সার রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের ওপর স্বজনদের হামলার ঘটনায় তৃতীয় দিনের কর্মবিরতি পালন করছেন ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকরা। আজ সোমবার (১৭ আগস্ট) তৃতীয় দিনের মতো কর্মসূচি শুরু হয়। এ দিন নতুন করে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অপরাধীরা গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে।

ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডাক্তার ও স্টাফদের উপর শারীরিকভাবে আঘাতের ঘটনায় আমরা ইন্টার্ন ডাক্তাররা স্পষ্ট ৩ দফা দাবি পেশ করেছিলাম। আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের জন্য কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের প্রধানতম দাবি দোষীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করা এখনো সম্ভব হয়নি। আমরা মুগদা থানা ওসি মহোদয় ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আটচল্লিশ ঘন্টার আশ্বাসের ভিত্তিতে অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়ে কর্মবিরতিতে যাই। এই ৪৮ ঘন্টায় হাসপাতালে প্রবেশদ্বারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, কিন্তু তা নামমাত্র। নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় সশস্ত্র আনসার মোতায়েন করার কথা ছিল, যেটি এখনো অপ্রতুল।

এতে আরও বলা হয়, আমাদের অন্যতম দাবি ছিল, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে মামলা করবে। এর প্রেক্ষিতে এফআইআর রুজু হয়েছে। কিন্তু আসামী গ্রেফতার না হওয়ায় আমরা মৌখিক আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছি না। ইতোপূর্বে আমাদেরকে অনেক মৌখিক আশ্বাস দেয়া হয়েছিল।

এ অবস্থায়, মুগদা মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মধ্যে আজকে আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসামীদের গ্রেফতার করা পর্যন্ত আমাদের কর্মবিরতি চলমান থাকবে। আমরা দ্রুত দাবিগুলো আদায়পূর্বক ডিউটিতে ফিরতে চাই। ২৪ ঘন্টায়ও আশানুরূপ ফলাফল না আসলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার রাতে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেন তার স্বজনরা। এতে তিনজন চিকিৎসক আহত হন। গুরুতর আহত হন আরও একজন ওয়ার্ডবয়। পরে তাকে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। আর আহত চিকিৎসকদের মধ্যে একজন ইন্টার্ন এবং একজন ট্রেইনি চিকিৎসক রয়েছেন।

এর আগে গত ১২ আগস্ট ফুসফুসের ক্যান্সার নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সাইফুল ইসলাম। ভর্তির সময় তার পরিস্থিতি ভালো ছিল না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের অভিযোগ, গত এপ্রিলে ক্যান্সার চিহ্নিত হলেও রোগীকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করেননি স্বজনরা। এ সময়ে তাকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবন করানো হয়। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে মুগদা মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়েছিল।

চিকিৎসকরা জানান, যে রোগী মারা গেছেন তার ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়েছে গত এপ্রিল। কিন্তু রোগীর স্বজনরা কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা করাননি। এরপর রোগীর অবস্থা যখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে যায়, তখন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

তারা বলেন, রোগীর স্বজনদের সব বুঝিয়ে বলা হয়—এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেফার করা হয়। কিন্তু সিট ফাঁকা না থাকায় আইসিইউ পাওয়া যায়নি। পরে স্বজনদের  বলে দেওয়া হয়েছিল যে মুগদায় থাকলে যেকোনো সময় পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। মৃত্যুর আগেও কর্তব্যরত চিকিৎসক দুইবার ফলোআপ দিয়েছেন।

ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জানান, রোগীর মৃত্যুর পর মৃত ঘোষণা করে স্বজনদের কাউন্সেলিং করা হয়। কিন্তু এর ১০ মিনিট পরই রোগীর আত্মীয়স্বজনেরা তেড়ে এসে ডিউটিরত ডাক্তার ও স্টাফকে আঘাত করেন।

এই ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেন চিকিৎসকরা। পরে সকাল ১১টা থেকে জরুরি বিভাগ ছাড়া টিকেট কাউন্টারসহ সকল পরিষেবা বন্ধ করে শাটডাউন ঘোষণা করেন। তবে পরে মৌখিক আশ্বাসে শাটডাউন প্রত্যাহার করে কর্মবিরতি শুরু করেন।

পরে চিকিৎসকদের ওপর হামলায় হামলাকারী দুজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনের বিরুদ্ধে মুগদা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ওয়ার্ড মাস্টার মো. মোস্তফা কামাল বাদী হয়ে করা মামলার আসামিরা হলেন মো. রুহান ও আসিফ। তাদের বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বড় হালিয়া এলাকায়। বর্তমানে যাত্রাবাড়ির সুতি খাল এলাকার বাসিন্দা। তারা মৃত রোগী সাইফুল ইসলামের (৫০) আত্মীয়।