মুগদা মেডিকেলে দ্বিতীয় দিনেও চলছে ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকদের কর্মবিরতি
রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ (মুমেক) হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্বিতীয় দিনেও ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকদের কর্মবিরতি চলছে। বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিন দফা দাবি আদায় না হওয়ায় এ কর্মবিরতি অব্যাহত রেখেছেন তারা। শুক্রবার রাতে চিকিৎসকদের ওপর হামলার পর গতকাল শনিবার (১৫ আগস্ট) বেলা ১১টা থেকে এই কর্মবিরতি শুরু হয়।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাত দেড়টার দিকে মুগদা মেডিকেলের মেডিসিন ওয়ার্ডের ইউনিট ২-এ কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেন রোগীর স্বজনরা। এতে তিন চিকিৎসক ও এক ওয়ার্ডবয় মারধরের শিকার হন। এর মধ্যে ওয়ার্ডবয় গুরুতর আহত হওয়ায় তাকে সার্জারি বিভাগে ভর্তি করা হয়। আহত চিকিৎসকদের মধ্যে একজন ইন্টার্ন এবং একজন ট্রেইনি চিকিৎসক রয়েছেন।
এ ঘটনায় বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিন দফা দাবি জানান ইন্টার্ন ও ট্রেইনি চিকিৎসকরা। মুমেক ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন ও পোস্টগ্রাজুয়েট ট্রেইনি অ্যাসোসিয়েশনের পৃথক বিবৃতিতে এই দাবি জানানো হয়। এগুলো হলো— দোষীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাদী হয়ে মামলা করতে হবে এবং ডিউটিরত চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ওয়ার্ডে সশস্ত্র আনসার বৃদ্ধি করতে হবে।
মুমেক ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. আব্দুল্লাহ আল মারুফ রবিবার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের দাবির প্রেক্ষিতে হাসপাতাল কর্তৃক একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। পুলিশের সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।
তিনি বলেন, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আনসার সদস্যদের স্বল্পতার কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয় বলে জানিয়েছে। বলেছে, যারা আছে তাদের মাধ্যমেই যতটুকু সম্ভব, বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা করছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত আনসার সদস্য আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে, যদিও সেটা একটা লম্বা প্রসেস।
কর্মবিরতি আরও চলবে কিনা জানতে চাইলে ডা. মারুফ বলেন, আমরা আজকে অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করছি। স্বাস্থ্য সেবা কোনোভাবেই বিঘ্নিত হোক এটা আমরা চাই না। সকলের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে আগামীকাল সকালে একটা সিদ্ধান্ত হয়তো জানাতে পারব।
এর আগে গত ১২ আগস্ট ফুসফুসের ক্যান্সার নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সাইফুল ইসলাম। ভর্তির সময় তার পরিস্থিতি ভালো ছিল না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের অভিযোগ, গত এপ্রিলে ক্যান্সার চিহ্নিত হলেও রোগীকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করেননি স্বজনরা। এ সময়ে তাকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবন করানো হয়। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে মুগদা মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়েছিল।
চিকিৎসকরা জানান, যে রোগী মারা গেছেন তার ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়েছে গত এপ্রিল। কিন্তু রোগীর স্বজনরা কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা করাননি। এরপর রোগীর অবস্থা যখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন হয়ে যায়, তখন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
তারা বলেন, রোগীর স্বজনদের সব বুঝিয়ে বলা হয়—এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেফার করা হয়। কিন্তু সিট ফাঁকা না থাকায় আইসিইউ পাওয়া যায়নি। পরে স্বজনদের বলে দেওয়া হয়েছিল যে মুগদায় থাকলে যেকোনো সময় পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। মৃত্যুর আগেও কর্তব্যরত চিকিৎসক দুইবার ফলোআপ দিয়েছেন।
ইন্টার্ন চিকিৎসকরা জানান, রোগীর মৃত্যুর পর মৃত ঘোষণা করে স্বজনদের কাউন্সেলিং করা হয়। কিন্তু এর ১০ মিনিট পরই রোগীর আত্মীয়স্বজনেরা তেড়ে এসে ডিউটিরত ডাক্তার ও স্টাফকে আঘাত করেন।
এই ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ করেন চিকিৎসকরা। পরে সকাল ১১টা থেকে জরুরি বিভাগ ছাড়া টিকেট কাউন্টারসহ সকল পরিষেবা বন্ধ করে শাটডাউন ঘোষণা করেন। তবে পরে মৌখিক আশ্বাসে শাটডাউন প্রত্যাহার করে কর্মবিরতি শুরু করেন।
পরে চিকিৎসকদের ওপর হামলায় হামলাকারী দুজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনের বিরুদ্ধে মুগদা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ওয়ার্ড মাস্টার মো. মোস্তফা কামাল বাদী হয়ে করা মামলার আসামিরা হলেন মো. রুহান ও আসিফ। তাদের বাড়ি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার বড় হালিয়া এলাকায়। বর্তমানে যাত্রাবাড়ির সুতি খাল এলাকার বাসিন্দা। তারা মৃত রোগী সাইফুল ইসলামের (৫০) আত্মীয়।