১৪ আগস্ট ২০২৬, ২১:৩৮

মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের চাকরিতে বৈষম্য ও হয়রানি বন্ধের দাবি

বিএমটিএ লোগো  © টিডিসি সম্পাদিত

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা সরকারি চাকরিতে প্রবেশাধিকার ও পেশাগত স্বীকৃতি নিয়ে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট অ্যালায়েন্স (বিএমটিএ)। অবিলম্বে এই বৈষম্য ও হয়রানি বন্ধের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

আজ শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিএমটিএর সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. গোলাম রসুল স্বপন ও মহাসচিব মো. শামীম শাহ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করা মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশাধিকার ও পেশাগত স্বীকৃতি নিয়ে আবারও বৈষম্য করা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের রায়, সরকারি গেজেট এবং অতীতে সরকারি পর্যায়ে নিয়োগের নজির থাকার পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ডিপ্লোমাধারী মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এতে নতুন করে হয়রানি ও বৈষম্যের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ডিপ্লোমা সম্পন্নকারীদের মধ্যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বৈষম্য চলে আসছিল। এ বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পর উচ্চ আদালতের রায়ে দুই ব্যবস্থার ডিপ্লোমাধারীদের সরকারি চাকরিতে প্রতিযোগিতার সমান সুযোগের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সম্প্রতি কারিগরি টেকনোলজিস্টদের নিয়োগে বৈষম্য ও হয়রানির শুরু হয়েছে।

বিএমটির অভিযোগ, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তাদের সনদ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সনদ, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও তাদের ‘ভুয়া’ প্রমাণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া শুধু সরকারি পর্যায়েই নয়, বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ডিপ্লোমাধারী মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে ডিপ্লোমা সম্পন্নকারীদের অযৌক্তিকভাবে নিয়োগের সুযোগ থেকে বাদ দেওয়া হলে তাদের পেশাগত অধিকার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে বড় ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না থাকায় হাজার হাজার ডিপ্লোমাধারী ও তাদের পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে হেলথ টেকনোলজি কোর্স চালু হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ফিল্ড ট্রেনিংয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন জটিলতা ও বাধার মুখে পড়েন। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে সরকারি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে নিয়োগের জন্য প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তিতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ডিপ্লোমা সম্পন্নকারীদের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

বিষয়টি নিয়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা আদালতের দ্বারস্থ হন। ২০১৬ সালের ২৪ মে হাইকোর্টের রায়ে সরকারি পর্যায়ে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি উঠে আসে। পরবর্তীতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০১৭ সালে উচ্চ আদালতে তা খারিজ হয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকে বলে তারা জানান। এ বিষয়ে ২০১৭ সালের লিভ টু আপিল নং ১৪২৩/২০১৭-এর আদেশের নথিও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড প্রকাশ করেছে।

আদালতের রায় ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে সরকার গেজেট প্রকাশ করে। সংশ্লিষ্টদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৪ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় বিভিন্ন স্বাস্থ্য পদে নিয়োগবিধি, নিয়োগ পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। ওই গেজেটে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই সময় ২০২ জন মেডিকেল টেকনোলজিস্টকে সরাসরি রাজস্ব খাতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে প্রায় ৮০ জন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা ছিলেন। একই বছরের জুন মাসে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার ভিত্তিতে ১৫০ জনের বেশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ডিপ্লোমাধারী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগ পেয়েছেন।

এ অবস্থায় বিএমটিএ বলছে, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ডিপ্লোমাধারীদের যোগ্যতা নিয়ে যদি প্রশ্ন থাকে, তাহলে জাতীয় দুর্যোগের সময় তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সরাসরি রাজস্ব খাতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল কীভাবে? একইভাবে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার ভিত্তিতে এত সংখ্যক টেকনোলজিস্ট নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টিও তাদের যোগ্যতার বাস্তব স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির বলে তারা মনে করেন।

সংগঠনটির দাবি, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি বিষয়ে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার পর অনেক মেডিকেল টেকনোলজিস্ট দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি ও এমএসসি পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। অনেকে বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত রয়েছেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে পাস করা মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।

বিজ্ঞপ্তিতে ‘ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট’ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে বিএমটিএ। এতে বলা হয়েছে, আদালত-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি ও প্রকাশিত তথ্যে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ডিপ্লোমা সম্পন্নকারীদের সরকারি চাকরিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি সংশোধন করে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে ‘ওয়ান আমব্রেলা কনসেপ্ট’ বাস্তবায়নের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। একই পেশাগত কাজে নিয়োজিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জনকারী দুই শিক্ষা ব্যবস্থার ডিপ্লোমাধারীদের জন্য অভিন্ন ও সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকলে দীর্ঘদিনের জটিলতার অবসান হতে পারে।