১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৭

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও যকৃতের যত্নে প্রতিদিন পান করুন এই ৫ পানীয়

স্বাস্থ্যকর পানীয়   © সংগৃহীত

সকালের রুটিনে নিজের যত্ন নিতে অনেকেই চা, গরম পানি কিংবা ঘরোয়া কোনো পানীয় বেছে নেন। তবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি বা যাঁদের এ রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের জন্য প্রতিদিনের পানীয় বেছে নেওয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রক্তে শর্করার ভারসাম্য, চর্বি প্রক্রিয়াজাত করা, হরমোনের কার্যক্রম ও শরীরে শক্তি জোগানোর ক্ষেত্রে যকৃত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যকৃতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির রাখাও কঠিন হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত খাবার ও শরীরচর্চার পাশাপাশি কিছু পানীয় যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।

পরিচিত চা থেকে শুরু করে রান্নাঘরে থাকা বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি পানীয়ের সঙ্গে প্রদাহ কমানো, বিপাকীয় কার্যক্রম ভালো রাখা ও যকৃতের কার্যকারিতা বাড়ানোর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এগুলো কোনো রোগের দ্রুত সমাধান নয়। সুষম খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা ও চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি এসব পানীয় দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।

পুষ্টিবিদ রূপালি দত্ত বলেন, ‘যকৃত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ শরীরের প্রায় সব বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। যকৃতের ওপর চাপ পড়লে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সঠিকভাবে ব্যবহার করলে পানীয়ভিত্তিক এসব সহজ অভ্যাস সামগ্রিক সুস্থতায় সহায়তা করতে পারে। তবে এগুলো তখনই উপকারী, যখন নিয়মিত রুটিনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এর সঙ্গে পুষ্টিকর খাবার ও নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে। এগুলো বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে, কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।’

বড় ধরনের জীবনযাত্রার পরিবর্তন না করেও প্রতিদিনের রুটিনে কিছু পানীয় রাখা যেতে পারে। যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো রাখা ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে এমন পাঁচটি পানীয় হলো:

১. গ্রিন টি

গ্রিন টিতে ক্যাটেচিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এগুলো যকৃতের প্রদাহ ও শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে যকৃতকে চর্বি প্রক্রিয়াজাত করতে সাহায্য করে এবং যকৃতের কোষে অতিরিক্ত চর্বি জমা কমাতে পারে। ডায়াবেটিসের পাশাপাশি যাঁদের ফ্যাটি লিভারের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

প্রতিদিন ২ থেকে ৩ কাপ গ্রিন টি পান করলে যকৃতের এনজাইমের মাত্রা কমাতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে এতে চিনি বা দুধ না মেশানোই ভালো। রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির রাখতে সহায়ক সুষম খাবারের সঙ্গে গ্রিন টি পান করলে যকৃতের ওপর চাপ কমাতেও সহায়তা করতে পারে।

২. লেবুপানি

প্রতিদিন এক গ্লাস হালকা গরম লেবুপানি যকৃতের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারে। লেবুতে ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এগুলো গ্লুটাথায়োনের মতো এনজাইম তৈরিতে সহায়তা করে। এই এনজাইম যকৃতকে শরীরের ক্ষতিকর উপাদান দূর করতে সাহায্য করে।

লেবুপানি হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে, পিত্তরসের প্রবাহ বাড়াতে এবং যকৃতের কার্যকারিতা ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে। সকালে খালি পেটে লেবুপানি পান করলে সময়ের সঙ্গে যকৃতে জমে থাকা চর্বি কমাতেও সহায়তা করতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান ও সুষম খাবারের সঙ্গে নিয়মিত লেবুপানি পান করলে এটি রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখার একটি সহজ অভ্যাস হতে পারে।

৩. বিটের রস

বিটের রসে বেটালেইন নামের উপাদান রয়েছে, যা যকৃতের জন্য সুরক্ষামূলক হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর উপাদান বের করতে, অক্সিডেটিভ ক্ষতি কমাতে এবং যকৃতের কোষ পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে।

সপ্তাহে ২ থেকে ৩ দিন বিটের রস পান করলে যকৃতের এনজাইমের মাত্রা উন্নত হতে এবং যকৃতে চর্বি জমা কমাতে সহায়তা করতে পারে। এতে প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রেটের পরিমাণও বেশি থাকে। এটি রক্ত চলাচল বাড়াতে সাহায্য করে, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হতে পারে।

এ কারণে যকৃতের যত্ন নেওয়া এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান—এমন ব্যক্তিরা খাদ্যতালিকায় বিটের রস রাখতে পারেন।

৪. অ্যাপল সিডার ভিনেগার

অ্যাপল সিডার ভিনেগারে অ্যাসিটিক অ্যাসিড থাকে। এটি হজমে সহায়তা করতে পারে এবং যকৃতে চর্বি জমা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। খাবারের আগে এক গ্লাস পানিতে এক টেবিল চামচ অ্যাপল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে পান করলে চর্বি ভাঙতে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমও ভালোভাবে চলতে পারে।

তবে অ্যাপল সিডার ভিনেগার সব সময় পানিতে মিশিয়ে খেতে হবে এবং পরিমাণও সীমিত রাখতে হবে। সরাসরি পান করলে বা অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে পেটে অস্বস্তি হতে পারে। সুষম জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে পরিমিতভাবে ব্যবহার করলে এটি দীর্ঘমেয়াদে যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে।

৫. হলুদপানি

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি যকৃতের যত্ন নিতে চান—এমন অনেকের সকালের রুটিনে হলুদপানি জায়গা করে নিয়েছে। হলুদে কারকিউমিন নামের একটি উপাদান রয়েছে। এর প্রদাহরোধী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি যকৃতকে শরীরের ক্ষতিকর উপাদান প্রক্রিয়াজাত করতে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে।

গরম পানিতে হলুদ মিশিয়ে পান করলে হজম স্বাভাবিক রাখা, বিপাকীয় কার্যক্রম স্থিতিশীল করা এবং যকৃতের চর্বি প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা করতে পারে। প্রতিদিন একবার পানিতে অল্প পরিমাণ হলুদ মিশিয়ে খেলে ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রদাহ কমাতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে।

তবে হলুদও পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে। বেশি পরিমাণে খেলে পেটে অস্বস্তি হতে পারে। সুষম খাবারের সঙ্গে পরিমিত পরিমাণে হলুদপানি পান করাই ভালো।

এই পানীয়গুলো কোনো রোগের চিকিৎসা বা নিরাময়ের উপায় নয়। তবে এগুলো এমন কিছু সহজ অভ্যাস, যা যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে উপকার পেতে এসব অভ্যাসের পাশাপাশি সুষম খাবার খেতে হবে, নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

প্রতিদিনের রুটিনে নিজের জন্য উপযোগী এমন একটি পানীয় যোগ করাই হতে পারে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের একটি সহজ পদক্ষেপ।