০৯ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৫০

রাতভর ঢাকার হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও মিলল না পিআইসিইউ, হাম আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু

শিশু আফিয়া  © টিডিসি ফটো

হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৬ মাস বয়সি শিশু আফিয়াকে বাঁচাতে শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাতে ফরিদপুর থেকে রাজধানী ঢাকায় এসেছিলেন স্বজনেরা। এর আগে ১৪ দিন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল শিশুটি। কোনো উন্নতি না দেখে উদ্ভ্রান্তের মতো ঢাকায় ছোটে তার পরিবার। প্রয়োজন ছিল অক্সিজেন সাপোর্ট এবং শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পি‌আইসিইউ) ছোট্ট একটি শয্যা। কিন্তু কোথাও মেলেনি। রাতভর হাসপাতালে হাসপাতালে দৌড়ে পি‌আইসিইউ না পেয়ে ভোরে ফিরতে হয়েছিল শিশুটিকে। 

আজ রবিবার (৯ আগস্ট) রাতে আফিয়া শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে। আফিয়ার চাচা জুনায়েদ শেখ জানিয়েছেন, রবিবার রাত ১০টার দিকে ফরিদপুরে শিশুটির মৃত্যু হয়। জানা গেছে, ১৭ দিন আগে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু আফিয়াকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান তার বাবা-মা। সাথে ছিল শ্বাসকষ্ট। প্রায় ১৪ দিন ফরিদপুর মেডিকেলে চিকিৎসা নিয়ে কোনো উন্নতি হয়নি। পরে গত শুক্রবার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকায় রওনা দেয় তার পরিবার।

সেদিন রাত ১২টার দিকে আফিয়াকে ঢাকায় আনা হয়। প্রথমে তাকে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে সেখানে পিআইসিইউ সুবিধা না থাকায় চিকিৎসকেরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর স্বজনেরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে সেখানেও পি‌আইসিইউ খালি পাওয়া যায়নি। এমনকি কোনো মতে একটি শয্যার ব্যবস্থা করে অক্সিজেন সাপোর্ট চাওয়া হলেও তা মেলেনি।

আফিয়ার চাচা জানিয়েছেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান স্বজনরা। কিন্তু সেখানেও পি‌আইসিইউ খালি পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আইসোলেশন সুবিধা না থাকায় হামের রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না।

পরে রাত প্রায় ৪টার দিকে আফিয়াকে নিয়ে স্বজনেরা মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পৌঁছান। সেখানেও চিকিৎসা মেলেনি শিশুটির। পরে আরও কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে কোনো আশ্বাস না পেয়ে ফরিদপুর ফিরে যান তারা।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রবিবার শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে পুনরায় ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ-খবর নেওয়া হয়। কিন্তু কোথাও পি‌আইসিইউ খালি থাকার তথ্য মেলেনি।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর চারটি সরকারি মেডিকেলের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া বাকি তিনটিতে কোনো পিআইসিইউ সুবিধা নেই। এগুলো হলো— স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিডফোর্ট হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এর মধ্যে অনুমোদন ছাড়া মিটফোর্ডে ৫ শয্যার একটি পি‌আইসিইউ থাকলেও তাতে প্রয়োজনীয় জনবল নেই।

চার মেডিকেল কলেজের বাইরে পিজি হাসপাতাল নামে পরিচিত বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএম‌ইউ) এবং কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার হাসপাতালেও নেই পি‌আইসিইউ সুবিধা। আর মহাখালীতে ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে পি‌আইসিইউ সুবিধা থাকলে এক বছরের নিচে হাম আক্রান্ত শিশুদের সেখানে ভর্তি নেয়া হয় না।

আফিয়ার চাচা মো. জুনায়েদ শেখ বলেন, শুক্রবার রাত ১২টার দিকে ভাতিজিকে ঢাকায় আনা হয়। শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল এবং আদ-দ্বীন হাসপাতাল ঘুরে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে যাওয়া হয় রাত ৪টায়। সেখান থেকেও ফিরতে হলো। সেই গাড়িতেই ফিরতে হলো ফরিদপুরে।

তিনি বলেন, আজ বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়েছি। পাওয়া যাচ্ছে না। প্রাইভেট কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিলাম। দৈনিক যে আইসিইউ ভাড়া বলছে, তা আফিয়ার পরিবারের জন্য বহন করা সম্ভব না। এর মধ্যে আমার ভাতিজিটা চলে গেল।

শিশুর চিকিৎসা না পেয়ে ক্ষুব্ধ জুনায়েদ শেখ বলেন, মূলত আফিয়াদের জন্য এ দেশ নয়। এ দেশ ধনীদের। এ দেশে সকল ব্যবস্থা এলিটদের জন্য। তাদের সমস্যা সমাধানেই সকল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট করা হয়েছে।