০৬ আগস্ট ২০২৬, ২২:২৬

৫৭% স্বাস্থ্যকর্মী অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিশুকে গুঁড়াদুধের পরামর্শ দিচ্ছেন

জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এই সেমিনার আয়োজিত হয়  © সংগৃহীত

দেশের ৫৭ শতাংশ স্বাস্থ্যপেশাজীবী আইন লঙ্ঘন করে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মায়েদের শিশুকে গুঁড়াদুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, শিশুর জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধই যথেষ্ট। তাই মাতৃদুগ্ধ বিকল্প (বিএমএস) আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে মাতৃদুগ্ধবান্ধব পরিবেশ এবং সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে ছয় মাসের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর করা জরুরি।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীর জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সম্মেলনকক্ষে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সুফিয়া খাতুন বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সাতটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে ৫৭ শতাংশ স্বাস্থ্যপেশাজীবী অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিশুকে গুঁড়াদুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেন, যা মাতৃদুগ্ধ বিকল্প আইন পরিপন্থী।

তিনি বলেন, চলতি বছরের এক গবেষণায় হাসপাতাল, দোকান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গুঁড়াদুধের পরোক্ষ প্রচার, অনিবন্ধিত পণ্য বিক্রি এবং স্বাস্থ্যপেশাজীবীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। একজন চিকিৎসক কোনোভাবেই কৌটাদুধ বা মাতৃদুগ্ধের বিকল্প পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারেন না।

অধ্যাপক ডা. সুফিয়া খাতুন আরও বলেন, অনিবন্ধিত পণ্য, দূষিত পানি, ভুল মাত্রায় প্রস্তুতকরণ এবং অপরিষ্কার বোতল ব্যবহারের কারণে শিশুদের মধ্যে জীবাণু সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে।

সেমিনারে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এস কে রায় বলেন, একটি শিশুর জন্মের পর পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজ—সব জায়গা থেকেই মাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে। মাতৃদুগ্ধ পান নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সহায়তা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।

তিনি বলেন, কর্মজীবী মায়েদের জন্য ছয় মাসের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ইতোমধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এ সুবিধা চালু করেছে। এখন বেসরকারি খাতেও একই সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু মাতৃত্বকালীন ছুটি নয়, কর্মক্ষেত্রে শিশুকে দুধ খাওয়ানোর জন্য নির্ধারিত কক্ষ, বিশ্রামাগার ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কর্মজীবী মায়েরা নির্বিঘ্নে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. সারিয়া তাসনিম বলেন, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি, পানি ও শক্তি মায়ের দুধ থেকেই পাওয়া যায়। এ সময়ে অতিরিক্ত কোনো খাবার বা পানির প্রয়োজন হয় না।

তিনি বলেন, মায়ের দুধ শুধু একটি খাদ্য নয়, এটি একটি জীবন্ত জৈবিক ব্যবস্থা। এতে থাকা উপকারী উপাদান ও অণুজীব শিশুর হজমক্ষমতা বৃদ্ধি, অন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

অধ্যাপক সারিয়া তাসনিম জানান, জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে শালদুধ খাওয়ানো হলে নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ৩১ শতাংশ কমে। এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু একচেটিয়াভাবে মায়ের দুধ পান করে, তাদের ক্ষেত্রে ইসকেমিক হৃদরোগে মৃত্যুঝুঁকি ৪৩ শতাংশ, স্ট্রোকে ৩৩ শতাংশ এবং ক্যান্সারজনিত মৃত্যুঝুঁকি ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা স্বাস্থ্যসেবায় পেশাগত সততা বজায় রেখে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান।

সেমিনারে বিবিএফ জাতীয় উপদেষ্টা কমিটিতে সংগঠনটিকে স্থায়ী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, পণ্য নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বাধীন কারিগরি প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত করা এবং মাতৃদুগ্ধ বিকল্প আইন বাস্তবায়ন, মনিটরিং ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা নিশ্চিত করার প্রস্তাব তুলে ধরে।

অনুষ্ঠানে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ, বিএমআরসি, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, বিএসসিআইআরসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।