সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে
সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আজ শনিবার (২৫ জুলাই) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত ‘হেলদি বাংলাদেশ ২০৪১’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় তারা এমন মন্তব্য করেন।
ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স (দায়রা) আয়োজিত ‘বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৬’-এর অংশ হিসেবে এই প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেশনটি সঞ্চালনা করেন জনস্বাস্থবিদ ও সিঙ্গাপুরের সিংহেলথ ডিউক-এনইউএস গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌফিক জোয়ারদার।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও প্রাক্তণ স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন, অধিকারকর্মী ড. শামারুহ মির্জা, রেনেটা পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এস. কায়সার কবির, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ড. কাজী আহমেদ জাকি এবং ব্র্যাক জেমস প্যান্ট গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর সেন্টার অব এক্সিলেন্স ফর হেলথ সিস্টেমস অ্যান্ড ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাসুদ আহমেদ।
আলোচনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অসংক্রামক রোগ, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য অর্থায়ন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ক্যান্সারের প্রকোপও বাড়বে। তাই প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি তামাক নিয়ন্ত্রণ, সংগঠিত ক্যান্সার স্ক্রিনিং, দ্রুত রেফারেল ব্যবস্থা এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ড. শামারুহ মির্জা বলেন, সুস্থ বার্ধক্য কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি জাতীয় উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সুস্থ বার্ধক্যে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যব্যয় কমবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। তিনি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা সম্প্রসারণ করে প্রাথমিক স্ক্রিনিং, স্বাস্থ্যশিক্ষা, টিকাদান এবং ডিমেনশিয়া ও ক্যান্সারের প্রাথমিক শনাক্তকরণে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান।
সৈয়দ এস. কায়সার কবির বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ কেবল ওষুধের মূল্য নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে গুরুতর অসুস্থতার কারণে কোনো পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে না পড়ে।
তিনি আরও বলেন, ওষুধ শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য কার্যকর নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য।
ড. কাজী আহমেদ জাকি বলেন, বাংলাদেশ সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পর্যায়নির্ভর ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ এবং শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা ভবিষ্যতে রোগের প্রাথমিক সতর্কতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
ড. সৈয়দ মাসুদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে জনসংখ্যাগত ও রোগের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা ও অসংক্রামক রোগ বাড়ছে, অন্যদিকে সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও রয়ে গেছে।
তিনি সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অর্থায়নের ঘাটতি দূর করা এবং শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, হেলদি বাংলাদেশ ২০৪১ বাস্তবায়নের জন্য প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, সার্বজনীন স্বাস্থ্য কভারেজ, টেকসই স্বাস্থ্য অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
একই সঙ্গে তারা বলেন, জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগই একটি সুস্থ, সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলার ভিত্তি হতে পারে।