২২ জুলাই ২০২৬, ১৩:৫২

মানহীন ৮ পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ, বাজারের অন্য পণ্য কতটা নিরাপদ?

প্রতীকি ছবি  © এআই সম্পাদিত ছবি

সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় চার প্রতিষ্ঠানের আট ধরনের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। সংস্থাটি জানিয়েছে, পরীক্ষায় এসব পণ্যে অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ, ক্ষতিকর অণুজীব এবং নির্ধারিত মানের ঘাটতি পাওয়া গেছে। তবে এ ঘটনায় বাজারে থাকা একই ধরনের অন্যান্য পণ্যের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিএসটিআই জানিয়েছে, নতুন করে অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওইসব পণ্যের উৎপাদন, বিক্রি ও বিতরণ বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে বাজার থেকে অবিলম্বে পণ্যগুলো প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যেসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ
প্রত্যাহারের তালিকায় রয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠানের আটটি পণ্য। এগুলো হলো: ফ্রেশ গার্ডেন এগ্রো রিসোর্সেস, কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অলিভ বাংলাদেশ লিমিটেড এবং ডেকো ফুডস লিমিটেডের বিভিন্ন খাদ্য ও প্রসাধনী পণ্য।

বিএসটিআইর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রেশ গার্ডেন এগ্রো রিসোর্সেসের আমের আচারে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি প্রিজারভেটিভ পাওয়া গেছে। কাজী ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের বেলিসিমো ব্র্যান্ডের রোটোন্ডো হ্যাজেলনাট কোটেড চকলেট আইসক্রিমের একটি ব্যাচে নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি মিল্ক সলিড নট-ফ্যাট শনাক্ত হয়েছে।

অলিভ বাংলাদেশ লিমিটেডের লাবণ্য ব্র্যান্ডের মিল্ক স্কিন লোশন, অ্যালোভেরা স্কিন লোশন, মোরিঙ্গা+মাচা ফোমিং মিল্ক ফেসওয়াশ এবং তুলসী ও লোভেরা ভ্যারিয়েন্টের শ্যাম্পুতে ক্ষতিকর অণুজীবের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ডেকো ফুডস লিমিটেডের ডেকো ফ্রুট ফান্ডা ব্র্যান্ডের ম্যাঙ্গো ও অরেঞ্জ ভ্যারিয়েন্টের সফট ড্রিংক পাউডারে বাংলাদেশ মানমাত্রার তুলনায় কম ভিটামিন 'সি' থাকায় সেগুলোও প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিএসটিআইর সার্টিফিকেশন মার্কস উইংয়ের পরিচালক মো. আলাউদ্দিন হুসাইন বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাজার থেকে পণ্য সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে আইন অনুযায়ী জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেন শুধু এই পণ্যগুলো?
বাজারে একই ধরনের আরও অসংখ্য পণ্য বিক্রি হলেও কেন শুধু এই আটটি পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে বিএসটিআই মহাপরিচালক (সচিব) কাজী ইমদাদুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযান নয়। নিয়মিত বাজার তদারকির অংশ হিসেবে র‌্যান্ডম স্যাম্পলিং বা এলোমেলোভাবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘বাজার থেকে নিয়মিত বিভিন্ন পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষায় যেসব পণ্য মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়, সেগুলো নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তবে মানদণ্ডে ব্যর্থ পণ্যগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’

অন্য পণ্যগুলো কি নিরাপদ?
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলমের মতে, কিছু প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ধরা পড়ায় বাজারের অন্যান্য পণ্য নিয়েও ভোক্তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে বিএসটিআই মহাপরিচালক বলেন, ‘বাজার তদারকি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভবিষ্যতেও নমুনা পরীক্ষা অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনে আরও পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।’

অনুমোদনের পরও কীভাবে মানের ঘাটতি?
বিএসটিআই জানায়, কোনো পণ্যের লাইসেন্স দেওয়ার সময় নির্দিষ্ট একটি ব্যাচের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। সেই ব্যাচে সব মানদণ্ড পূরণ হলেই লাইসেন্স দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে উৎপাদিত প্রতিটি ব্যাচ একই মান বজায় রাখছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত ফলো-আপ পরীক্ষা করা হয়।

আরও পড়ুন : ইউপি চেয়ারম্যান পদে ন্যূনতম স্নাতক যোগ্যতা চেয়ে হাইকোর্টের রুল

কাজী ইমদাদুল হক বলেন, ‘লাইসেন্স পাওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পরবর্তী ব্যাচে মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখনই তা পরীক্ষায় ধরা পড়ে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে হাজারো পণ্য ও সীমিত জনবলের কারণে নির্দিষ্ট সময়সূচি ধরে প্রতিটি পণ্য পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না।’

প্রত্যাহারের নির্দেশ বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব?
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মাহবুব কবীর মিলনের মতে, উন্নত দেশগুলোতে পণ্য প্রত্যাহার ব্যবস্থা কার্যকর হলেও বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা ও সরবরাহ শৃঙ্খলার বাস্তবতায় এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন।

তিনি বলেন, ‘বাজারে পৌঁছে যাওয়া অধিকাংশ পণ্য ভোক্তাদের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। ফলে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেও সব পণ্য ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।’

অন্যদিকে বিএসটিআই বলছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্য বিক্রি করা আইনত অপরাধ। সীমিত জনবল নিয়েও বাজারে নজরদারি চালানো হবে এবং প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অনিয়ম ধরা পড়ার পর পণ্য প্রত্যাহার নয়, বরং নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা ও বাজার তদারকি জোরদার করাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। একই সঙ্গে বিএসটিআই ও বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে, যাতে ভোক্তারা নিরাপদ পণ্য নিশ্চিতভাবে পেতে পারেন। তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা।