এডিস কামড়ায় দিনে, মশারি দিয়ে ডেঙ্গু ঠেকানো সম্ভব নয়: এমপি ফরিদ
ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় কামড়ায়, তাই কেবল মশারি দিয়ে ডেঙ্গু ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন যশোর-২ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। তার মতে, ডেঙ্গু দমনের প্রধান কৌশল হওয়া উচিত লার্ভা নিধন এবং এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা। এক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের অভাবই প্রধান সমস্যা বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
আজ সোমবার (২০ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে দেশে ডেঙ্গু জ্বরের ক্রমবর্ধমান প্রকোপ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম-এনডিএফ আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগম।
অনুষ্ঠানে কী-নোট স্পিকার হিসেবে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর-উল আলম সোহেল। এতে প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিসিএস হেলথ ফোরামের সভাপতি ও মুগদা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মাহবুব ইসলাম মজুমদার এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল্লাহ সাঈদ খান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ জানান, প্রতিবছর ডেঙ্গুর কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তিনি এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০০ মানুষ মারা যায় এবং ১ লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়। কিন্তু এই ১ লক্ষের হিসাবটি প্রকৃত চিত্রের ক্ষুদ্র অংশ বা ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’, কারণ দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এখনো অনিবন্ধিত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন, যাদের তথ্য সরকারি রেকর্ডে আসে না।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর ক্ষয়ক্ষতি শুধু চিকিৎসার খরচেই সীমাবদ্ধ নয়। আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে ‘ফ্যাটিগ’ বা চরম শারীরিক দুর্বলতায় ভোগেন। এর ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার ক্ষতি হয় এবং কর্মক্ষম মানুষ দীর্ঘ সময় কাজ বা ব্যবসা-বাণিজ্যে যোগ দিতে পারেন না, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সেমিনারে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পার্থক্য তুলে ধরেন। বলেন, ম্যালেরিয়ার বাহক এনোফিলিস মশা মূলত রাতে কামড়ায়, যা মশারি দিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা মূলত দিনের বেলায় কামড়ায়, তাই কেবল মশারি দিয়ে ডেঙ্গু ঠেকানো সম্ভব নয়। তার মতে, ডেঙ্গু দমনের প্রধান কৌশল হওয়া উচিত লার্ভা নিধন এবং এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস করা।
ডা. ফরিদ সতর্ক করে বলেন, এডিস মশার লার্ভা অত্যন্ত সহনশীল; এটি শুষ্ক অবস্থায় প্রায় এক বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। যখনই এটি পানি পায়, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মশায় রূপান্তরিত হয়। তাই মাঝে মাঝে মশা মারার স্প্রে করা বা ছোটখাটো প্রকল্প নেওয়া যথেষ্ট নয়। ডেঙ্গু নির্মূল করতে হলে এই প্রজনন চক্র বা ‘চেইন অব সাইকেল’ ভাঙতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতের সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি বলেন, সরকারের কাছে অর্থের অভাব নেই। উদাহরণস্বরূপ তিনি জানান, গত বছর স্বাস্থ্য খাতের ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকাই ফেরত গেছে। সমস্যাটি মূলত সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের। এই সমন্বয়হীনতা দূর করতে তিনি অবিলম্বে সংসদীয় স্বাস্থ্য কমিটি কার্যকর করার ওপর জোর দেন, যাতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও জোরালো ভূমিকা রাখা যায়।
তিনি নির্মাণাধীন ভবন, ফুলের টব এবং রাস্তার পাশের ছোট ছোট গর্তে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে লার্ভা জন্মানোর পথ বন্ধ করার আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে জনগণকে সচেতন করার পরামর্শ দেন। এনডিএফের মতো পেশাজীবী সংগঠনগুলো গবেষণামূলক কাজের মাধ্যমে সরকারকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথি মারজিয়া বেগম এমপি বলেন, ডেঙ্গু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অধিকাংশ রোগীই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তিনি গুজব ও অপচিকিৎসা থেকে বিরত থেকে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
কী-নোট স্পিকার ডা. মো. জাহাঙ্গীর-উল আলম সোহেল ডেঙ্গু রোগের বর্তমান পরিস্থিতি, এডিস মশার জীবনচক্র, রোগের লক্ষণ, সতর্ক সংকেত, রোগ নির্ণয়, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং জটিলতা প্রতিরোধ বিষয়ে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক উপস্থাপনা করেন। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন বা বিলম্বিত চিকিৎসা রোগীর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। তিনি হাসপাতালের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করার তাগিদ দেন। একই সাথে তিনি চিকিৎসকদের সর্বদা জনগণের পাশে থেকে নিরলসভাবে সেবা প্রদানের আহ্বান জানান।
সেমিনারে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষক, স্বাস্থ্য পেশাজীবী, গণমাধ্যমকর্মী, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।