০৯ জুলাই ২০২৬, ১৮:১২

শিশু ও পরিবারের স্বাস্থ্যসেবায় নগর এলাকায় ‘আলো ক্লিনিক’ মডেল সম্প্রসারণের চিন্তা সরকারের

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত জাতীয় ডিসেমিনেশন কর্মশালায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল  © সংগৃহীত

নগর এলাকায় শিশু ও পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা জোরদারে ‘আলো ক্লিনিক’ মডেল সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। আজ বুধবার (৯ জুলাই) রাজধানীর একটি হোটেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত জাতীয় ডিসেমিনেশন কর্মশালায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। কর্মশালায় ‘আলো ক্লিনিক’ মডেলের প্রমাণভিত্তিক ফলাফল, বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা এবং কার্যক্রম থেকে অর্জিত শিক্ষাগুলো তুলে ধরা হয়, যাতে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বিভিন্ন প্রমাণে দেখা যাচ্ছে যে, আলো ক্লিনিক মডেলটি সুবিধাবঞ্চিত নগর জনগোষ্ঠীর শিশু, নারী এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করছে। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার এখন আলো ক্লিনিক মডেল সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করছে।

আলো ক্লিনিক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। সুইডেন দূতাবাস, ইউনিসেফ ও পিএইচডি সংগঠনের সহযোগিতায় এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

কর্মশালায় জানানো হয়, বাংলাদেশে নগর জনসংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও এখনো অনেক শিশু ও পরিবার সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ২০২১ সাল থেকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জে স্থাপিত ছয়টি আলো ক্লিনিক জাতীয় এসেনশিয়াল সার্ভিসেস প্যাকেজের (ইএসপি++) আওতায় বিনামূল্যে, সমন্বিত এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে আসছে।

এতে আরও জানানো হয়, আলো ক্লিনিক মডেলের আওতায় মাতৃ, নবজাতক ও শিশুসেবা, টিকাদান, পুষ্টি স্ক্রিনিং, রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাসহ নানা ধরনের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ১৬৮ জন রোগী এসব সেবা গ্রহণ করেন। কমিউনিটি আউটরিচ এবং ডিজিটাল গৃহভিত্তিক পরিদর্শনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীরা গর্ভবতী নারী শনাক্ত করেন, শিশুদের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করেন এবং পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংযুক্ত করেন। চারটি ক্লিনিকে ২৪/৭ ধাত্রী-নেতৃত্বাধীন নরমাল ডেলিভারি সেন্টার চালু রয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১,০০০-এর বেশি নিরাপদ প্রসবসেবা প্রদান করা হয়েছে।

কর্মশালায় আলো ক্লিনিক মডেলের চার বছরেরও বেশি সময়ের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত শিক্ষা তুলে ধরা হয়, যা মডেলটি সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বে এবং সুইডেন সরকারের অর্থায়নে ইউনিসেফ এই আলো ক্লিনিক মডেলটি উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন করেছে।

আরবান হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেলেন্স সিস্টেমের (ইউএইচডিএসএস) তথ্য-প্রমাণে দেখা গেছে, কর্মসূচির আওতাভুক্ত এলাকায় মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য-ফলাফলে ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক প্রসবের হার বৃদ্ধি এবং নবজাতক, শিশু ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু হ্রাস।

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, দেশের মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এই দেশের প্রতিটি নাগরিকের মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, তিনি যেখানেই থাকুন না কেন কিংবা তার আর্থিক সামর্থ্য যেমনই হোক না কেন। সবাইকে একসঙ্গে এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা হবে সহজপ্রাপ্য, জবাবদিহিমূলক, জনগণমুখী এবং সহনশীল।

নগরায়ণের ফলে শহরের ‘ভাসমান ও নিম্নআয়ের’ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী আলো ক্লিনিকের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। বলেন, শহরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে যেভাবে আলো ক্লিনিক মানসম্মত সেবা পৌঁছে দিচ্ছে, তা সত্যিই অনুকরণীয়। আলো ক্লিনিক কীভাবে সফলভাবে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে, তা থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই আমি নিজে তাদের একটি ক্লিনিক পরিদর্শন করব। সিটি কর্পোরেশনের কাছ থেকে আমরা যে ১৯২টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব নিয়েছি, সেখানে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে।

সব মানুষের জন্য টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিপুল অর্থ খরচ করে বেসরকারি হাসপাতালে সব মানুষের পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়। তাই সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সেখানে আস্থা পায়। বিশেষজ্ঞদের মূল্যবান পরামর্শগুলো আমলে করে কাজের পরিধি আরও বাড়ানো হবে।

তিনি বলেন, চিকিৎসার অভাবে আমরা এ দেশের একটি মানুষকেও মরতে দিতে চাই না। দেশের একদম শেষ প্রান্তের মানুষটির কাছেও চিকিৎসা সহজলভ্য করতে চাই এবং আমরা তা করব, আমাদের তা করতেই হবে। দেশের জনসংখ্যা যত বড়ই হোক না কেন, সমগ্র জনগোষ্ঠর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আমাদের অঙ্গীকার।

স্বাস্থ্যখাতে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমরা তৃণমূলের হাসপাতালগুলোতে কিডনি ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছি। বিশেষ করে উপজেলা হাসপাতাল, জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল এবং জেলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এই কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারিত করা হবে। সেইসঙ্গে দুর্গম এলাকার রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য সর্বোচ্চসংখ্যক অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিচ্ছি।

সভায় আলো ক্লিনিক মডেলের চার বছরেরও বেশি সময়ের বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত শিক্ষা তুলে ধরা হয়, যা মডেলটি সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। আলো ক্লিনিক মডেলের আওতায় মাতৃ, নবজাতক ও শিশুসেবা, টিকাদান, পুষ্টি স্ক্রিনিং, রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাসহ নানা ধরনের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ১৬৮ জন রোগী এসব সেবা গ্রহণ করেন। কমিউনিটি আউটরিচ এবং ডিজিটাল গৃহভিত্তিক পরিদর্শনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীরা গর্ভবতী নারী শনাক্ত করেন, শিশুদের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করেন এবং পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংযুক্ত করেন। চারটি ক্লিনিকে ২৪/৭ ধাত্রী-নেতৃত্বাধীন নরমাল ডেলিভারি সেন্টার চালু রয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১,০০০-এর বেশি নিরাপদ প্রসবসেবা প্রদান করা হয়েছে।

সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, বাংলাদেশে  ইউনিসেফের ডেপুটি  প্রতিনিধি অ্যামানুয়েল এ্যাব্রোক্স, ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. মালালাই আহমেদজাই, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।