স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও কাঁচি থেকে আধুনিক যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনতে হয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহে সাশ্রয়ী, উপযোগী ও টেকসই স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিগত বৈষম্য দূরীকরণে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি ফর হেলথকেয়ার ইন লো অ্যান্ড মিডল-ইনকাম কান্ট্রিজ (আইসিএটিএইচ-এলএমসি) শুরু হয়েছে। আজ রবিবার (৫ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে দুই দিনব্যাপী এই কনফারেন্সের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ (বিএমপিটি), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, BiBEAT Ltd. এবং রেলেভেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সোসাইটি (আরএসটিএস) যৌথভাবে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও গবেষণার এই সমন্বিত উদ্যোগ দেশের স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি খাতে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রবিবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি জানান, বাংলাদেশে এখনও গ্লুকোমিটার, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র, স্টেথোস্কোপ, সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টসহ অসংখ্য সাধারণ মেডিকেল ডিভাইস বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। অথচ এসব ডিভাইসের একটি বড় অংশ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের সমন্বিত উদ্যোগে সহজেই দেশে উৎপাদন করা সম্ভব।
তিনি আরও জানান, দেশীয় উদ্ভাবক, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে, যাতে বাংলাদেশে মেডিকেল ডিভাইস শিল্প গড়ে ওঠে, আমদানি নির্ভরতা কমে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং বাংলাদেশ স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবনে একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে নিউমোনিয়া আক্রান্ত নবজাতকদের জীবন রক্ষায় দেশের চিকিৎসকের উদ্ভাবিত সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ‘বাবল সি-প্যাপ’-এর প্রশংসা করে চিকিৎসাক্ষেত্রে দেশীয় উদ্ভাবন ও গবেষণায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, যে অক্সিজেনটি নবজাতকের ফুসফুসে প্রবেশ করে না, তা একটি বোতলে ফিরে এসে বুদবুদ তৈরি করে এবং পুনরায় সেখান থেকে ফুসফুসে অক্সিজেনের প্রবাহ নিশ্চিত করে। এটি ফুসফুসকে পরিষ্কার রাখে এবং পুনরায় অক্সিজেন গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরি করে। মাত্র ৩০০ টাকা খরচের এই সিস্টেমটি ব্যবহার করে শিশুদের বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছি। এর জন্য সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবকের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
তিনি বলেন, দেশের বিজ্ঞানীরা যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন, যেমনটি আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে দেখিয়েছিলাম। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পার হলেও চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা দুঃখজনক। কাঁচি থেকে শুরু করে প্যাথলজিক্যাল টেস্টের আধুনিক যন্ত্রপাতি— সবই আমাদের বিদেশ থেকে আনতে হয়, যা আমাদের অর্থনীতির জন্য কাম্য নয়।
আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, আমাদের মূল সমস্যা হলো সঠিক উদ্যোগ ও ধারাবাহিক সহায়তার অভাব। গ্রামীণ পর্যায় থেকেও অনেক বিজ্ঞানী উঠে আসছেন, কিন্তু তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমান বাজেটে নতুন নতুন উদ্ভাবনের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে এ ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক।
চিকিৎসাখাতের উন্নয়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নে কাজ করতে সক্ষম এমন ব্যক্তিবর্গ ও প্রতিষ্ঠান যদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি নিজে তাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করতে প্রস্তুত এবং সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করব।
নিজস্ব প্রযুক্তিতে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, একদল বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে একটি প্রকল্প উপস্থাপন করেছেন। তারা দুই ধরনের দেশীয় অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করতে যাচ্ছেন— একটি দুর্গম গ্রামীণ অঞ্চল থেকে রোগী আনার জন্য এবং অন্যটি দূরপাল্লার যাতায়াতের জন্য। আগামী চার বছরের মধ্যে এই প্রকল্পকে চূড়ান্ত রূপ দিতে সরকার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করতে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানিতে প্রতিদিন দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। যদি দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা স্থানীয়ভাবে এসব প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম তৈরি করতে পারেন, তবে সরকার স্থানীয় উৎপাদন নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করবে। এটি একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটাবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় দেশের প্রতিটি গ্রাম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে চিকিৎসকদের পাশাপাশি দেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের এগিয়ে আসতে হবে। আপনারা যদি দেশেই উন্নতমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম উদ্ভাবন করতে পারেন, তবে বিদেশি ডিলারদের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় বন্ধ হবে এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং জাতীয় অধ্যাপক এ. কে. আজাদ খান।
দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা উপযুক্ত স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেল ডিভাইস, টেলিমেডিসিন এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য টেকসই প্রযুক্তি উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করবেন। সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার, শিল্পখাত ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং স্বল্প ব্যয়ে স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করা।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে সেরিমোনিয়াল চেয়ার অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন এ সংক্রান্ত পরবর্তী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ২০২৭ সালের নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হবে। তিনি দেশি-বিদেশি গবেষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক এবং নীতিনির্ধারকদের আরও বৃহত্তর অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।