০৪ জুলাই ২০২৬, ২২:৪২

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল: তদন্তে মেলেনি ৬ শিশুর মৃত্যুর ‘সুস্পষ্ট কারণ’, হয়নি পরীক্ষা-নিরীক্ষা

আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোগো  © টিডিসি সম্পাদিত

রাজধানীর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ২৭ মে ভোরে তিন ঘণ্টার মধ্যে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঈদুল আজহার আগের দিনের এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য প্রশাসন। ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাতিলও হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পোস্ট অপারেটিভ কক্ষটিতে অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে ওই ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যেও বলেছেন, অক্সিজেন স্বল্পতাজনিত কারণে ‘হাইপারক্যাপনিয়া’য় আক্রান্ত হয়ে তারা মারা গেছে। তবে যে তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ওই তদন্ত প্রতিবেদনে চারটি কারণের কথা বলা হয়েছে, যা উল্লেখ করা হয়েছে ‘সম্ভাব্য কারণ’ হিসেবে। সম্ভাব্য এসব কারণ হলো— বদ্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, এসি বন্ধ থাকা, বিকল্প ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেন কমা এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। প্রতিবেদন বলছে, এসবের ফলে নবজাতকগুলোর টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

এদিকে আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় বিপদে পড়েছেন এর সঙ্গে যুক্ত মেডিকেল কলেজের দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে ভারতীয় প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসক পড়াশোনা শেষ করে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে ডিগ্রির গ্রহণযোগ্যতা হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে সমস্যা সমাধানে তারা ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সহযোগিতাও কামনা করেছেন। মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতেও গেছেন। তবে কোনো সুরাহা না মেলায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

মেডিকেল কলেজের বিদেশি শিক্ষার্থী দিল্লি থেকে আসা ফাতিমা এবং রাজস্থানের মুসকান বানু দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমরা মূলত যে সমস্যা ফেস করছি, তা হলো— ইন্ডিয়াতে আমাদের ডিগ্রি ইনভ্যালিড হয়ে যাবে। কারণ এনএমসি (ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন) নীতিমালা অনুযায়ী, আমাদের একই কলেজ থেকে ডিগ্রি এবং একই কলেজের হাসপাতাল থেকে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু তাদের (স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর) কথা অনুযায়ী, আমাদের অন্য কলেজে মাইগ্রেট করতে হবে, যা আমরা ভারতে ফিরে যাওয়ার পর আমাদের জন্য অনেক বড় সমস্যা তৈরি করবে। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী ডিপ্রেসড হয়ে পড়ছে।’

বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনেও আলোচনা হয়েছে। সেখানে হাসপাতালটিকে গরিবের সেবা নেওয়ার অন্যতম মাধ্যম উল্লেখ করে খুলে দেওয়ার দাবি তোলা হয় বিরোধীদল থেকে। ছয় শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের শাস্তিরও দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলের কয়েকজন সংসদ সদস্য। তারা বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আদ-দ্বীনের পক্ষে-বিপক্ষে হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

এসবের জবাব জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তবে হাসপাতাল খুলে দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তিনি। যদিও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা হাসপাতালের লাইসেন্স ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এখনও স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় এ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের।

সরকারের দুই তদন্ত কমিটি, প্রতিবেদন একটি
২৭ মে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর পর মৃত এক শিশুর বাবা রমনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এরপর পুলিশ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শন করে বিভিন্ন অসঙ্গতি পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এ ঘটনায় পরদিন ২৮ মে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এতে প্রধান করা হয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব (বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা শাখা) মো. মহসীনকে। এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (আইন) ডা. আনোয়ার হোসেন এবং সদস্য সচিব ছিলেন উপ-পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. এসএএ শাফী।

হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় শিক্ষাজীবনও শঙ্কায় পড়েছে আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজের দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীদের, সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিদেশি শিক্ষার্থীরা

গত ১ জুন পৃথক আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই কমিটিতে প্রধান করা হয় অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদকে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির অপর দুই সদস্যও এই কমিটিতে একইভাবে অন্তর্ভুক্ত হন। এ ছাড়া পৃথকভাবে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও, যার প্রতিবেদন তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে জমা দেয়।

ছয়টা শিশু যখন চার হাত-পা বাইরিয়ে (ছোড়াছুড়ি) যখন বিছানায় কাঁদতেছিল বাঁচার জন্য, সে হাইপারক্যাপনিয়ায়, এসি বন্ধ করে দিয়েছে। ঘরে জানালা নেই। কাঁচ বন্ধ। কোন অক্সিজেন নেই। ১৬-১৭ জন মানুষ, মায়েরা কাঁদতেছে, ছুটাছুটি করতেছে। সেই বাচ্চাগুলি ছটফট করতে করতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের জন্য তারা মৃত্যুর উপরে ঢলে পড়েছে সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, স্বাস্থ্যমন্ত্রী (গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্য)

৪ জুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত কমিটি। এর আগের দিন ৩ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটিও একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তবে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের অনুসন্ধানে এই প্রতিবেদনের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদন তৈরি না হওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রধান ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব (বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা অধিশাখা) মো. মহসীন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের কাছে এ তথ্য স্বীকারও করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘১৯৮২ সালের আইন অনুযায়ী এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেখবে। যখন আইনের মাধ্যমে অধিদপ্তরকে ক্ষমতা দেওয়া হয়...। আর আপিলের বিষয়টা মন্ত্রণালয়ের।’

আরও পড়ুন: আদ-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ হলে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের দায় কে নেবে?

তিনি বলেন, ‘আপিল করলে মন্ত্রণালয় আপিল শুনানি করবে। এজন্য একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। কারণ আইনের মধ্যে থেকে যেটা, সেটাই করতে হবে, আইনের মাধ্যমেই যেতে হবে। অধিদপ্তর থেকেও যা অ্যাকশন নেওয়ার নিয়েছে। এখন তারা (হাসপাতাল) আপিল করেছে, মন্ত্রণালয় সেটি বিবেচনা করতে পারে।’

মন্ত্রীর বক্তব্যে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর কারণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর ৪ জুন সংবাদ সম্মেলন ডাকে মন্ত্রণালয়। ওই দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মৃত্যুর কারণ হিসেবে অক্সিজেনের মাত্রার ঘাটতি ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধির তথ্য জানান। তিনি লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘তদন্ত কমিটির নিকট সংশ্লিষ্ট পোস্ট অপারেটিভ কক্ষ নম্বর দুই পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ শেষে প্রতীয়মান হয় যে, কক্ষটিতে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং স্বাভাবিক ভেন্টিলেশন কার্যক্রম না থাকায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের মাত্রার ঘাটতি হয়েছে ও পক্ষান্তরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ছিল।’

গত ২৮ জুন সংসদে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

একই বক্তব্যে নার্সদের অবহেলা ও অসহযোগিতার তথ্যও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘দায়িত্বরত সকল সেবিকা, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও মৃত নবজাতকদের অভিভাবকগণের বক্তব্যে প্রমাণ পেয়েছে যে, দায়িত্বরত সেবিকাদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ও অসহযোগিতা ছিল। নবজাতকের আকস্মিক শারীরিক অবনতিশীল অবস্থায় হাসপাতালের সক্রিয় ইমারজেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ছিল না। অভিভাবকদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নার্স কোন চিকিৎসককে বিষয়টি অবহিত না করে কালক্ষেপন করতে থাকে। এমনকি নবজাতকদের মৃত্যুরোধে প্রয়োজনীয় উপযুক্ত যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়নি।’

গত ১৩ জুন নিজ সংসদীয় এলাকা নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে একটি অনুষ্ঠানে আদ্-দ্বীনের প্রসঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ওই দিন তিনি চিকিৎসক ডিউটিতে না থাকার কথাও বলেন, আবার বলেন ‘চিকিৎসকের অবহেলা’র কথাও। তার ভাষ্য, ‘একটা বাচ্চাকে নিয়ে গেছে উপরে, ১৫ মিনিটে সেই বাচ্চা ভালো। ঘর থেকে নেয়ার ১৫ মিনিট পরে যে বাচ্চাটা ভালো হলো, তখনই তো ডাক্তারের চিন্তা করা উচিত বাচ্চাটা এখন ভালো হইলো কেন? আমি যে আনাড়ি, ডাক্তার না, আমিও তো বুঝতাম যে বাচ্চা তো মুক্ত বাতাসে এসে ভালো হয়েছে, তার মানে ওইখানে অক্সিজেন পায় নাই। আবার বাচ্চাটাকে ঘরে নিছে, নেয়ার পরে ছয়টা বাচ্চা একসাথে মারা গেছে।’

আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ

১৬ জুন মগবাজারে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েও আদ্-দ্বীন প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ওই দিনও তিনি চিকিৎসক ডিউটিতে না থাকার কথা বলেন। পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে ডিউটি ডাক্তার না থাকায় ক্ষোভও ঝরে তার কণ্ঠে। একই সঙ্গে দাবি করেন, ঘটনার সময় কক্ষটিতে ৭ শিশুসহ ১৬ থেকে ২৫ জন মা ও অ্যাটেন্ডেন্ট ছিলেন। বলেন, ‘আপনাদের কাছ থেকেই শুনেছি, ৩ মিনিট একটা বাচ্চা বাঁচতে পারে উইদাউট অক্সিজেন। আর ১৩-১৪ মিনিট একটা অ্যাডাল্ট লোক বাঁচতে পারে। ৬টা বেবি একনাগাড়ে কান্নাকাটি করতেছে। নার্সকে মায়েরা চিৎকার করে ডাকতেছে, আসে না। ডিউটিতে কোনো ডাক্তার নেই, অথচ ওইটা একটা পোস্ট অপারেটিভ রুম।’

গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আবারও এই প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখেন। ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে ৬ শিশুর মৃত্যুর বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আদ্-দ্বীনের যে ঘটনা ঘটেছে, আপনারা কেউ যাননি, আজকে সংসদে কথা বলেন আপনারা। ছয়টা শিশু যখন চার হাত-পা বাইরিয়ে (ছোড়াছুড়ি) যখন বিছানায় কাঁদতেছিল বাঁচার জন্য, সে হাইপারক্যাপনিয়ায়, এসি বন্ধ করে দিয়েছে। ঘরে জানালা নেই। কাঁচ বন্ধ।’

তিনি বলেন, ‘কোনো অক্সিজেন নেই। ১৬-১৭ জন মানুষ, মায়েরা কাঁদতেছে, ছুটাছুটি করতেছে। সেই বাচ্চাগুলি ছটফট করতে করতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের জন্য তারা মৃত্যুর উপরে ঢলে পড়েছে। মালিক দেখতে পর্যন্ত যাননি। আমি গিয়েছি পরের দিন, আমি দুজন ডাক্তারের সাথে কথা বলেছি। দে এগ্রিড, অবহেলার কারণে, অক্সিজেনের অভাবে বাচ্চাগুলি মারা গিয়েছে।’

হাইপারক্যাপনিয়া একটি ক্লিনিক্যাল টার্ম, এটি এমন একটি শারীরিক অবস্থা— যখন রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে রোগীর মাথাব্যথা, ঝিমুনি, শ্বাসকষ্ট এবং চরম পর্যায়ে চেতনা হারানোর মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুও হতে পারে।

এদিকে গত ১ জুলাই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে সচেতনতার পরামর্শ দিতে গিয়ে আদ্ব-দ্বীনের প্রসঙ্গে কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ওই সময়ও তিনি চিকিৎসকদের অবহেলার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আইসিইউর ভিতরে রোগী, সেটা আপনাদের ম্যানেজ করতে হবে। রোগী যদি ছটফট করে, আপনারা যদি বাইরে গল্প করেন আদ্-দ্বীনের ডাক্তারের মতো, কী লাভ হবে আমার আইসিইউ করে?’

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাইপারক্যাপনিয়া একটি ক্লিনিক্যাল টার্ম, এটি এমন একটি শারীরিক অবস্থা— যখন রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে রোগীর মাথাব্যথা, ঝিমুনি, শ্বাসকষ্ট এবং চরম পর্যায়ে চেতনা হারানোর মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুও হতে পারে।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গিয়ে নিরাশ হয়ে ফিরলেন আদ্-দ্বীনের বিদেশি শিক্ষার্থীরা, বসতে রাজি নয় কেউ

বক্তব্যের ধারাক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভিন্ন সময়ের দেয়া বক্তব্যে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিজনিত ক্ষোভ, আবার কখনও তাদের দায়িত্বে অবহেলার কথাও বলা হয়েছে মন্ত্রীর বক্তব্যে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিঠিতে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের কথা বলা হলেও সংসদে দেওয়া বক্তব্যে ‘লাইসেন্স স্থগিত’ করার কথা বলেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত কমিটির দেয়া ১০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের শেষ পৃষ্ঠায় ‘মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ’ বর্ণনা এবং ‘তদন্ত কমিটির মন্তব্য’ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘যদিও অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ বের করা সম্ভব নয়, তথাপি পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য ও জবানবন্দি থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে মৃত্যুর কারণ হিসাবে বিবেচনা করা যায়।’

কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ‘ছোট বদ্ধ কক্ষে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোন ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, যা নবজাতক শিশুর দীর্ঘ সময় টিকে থাকার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।’

আমি যা দেওয়ার লিখিতভাবে দিয়ে দিয়েছি। এসব নিয়ে কিছু বলা আমার নিষেধ আছেঅধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ, পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও তদন্ত কমিটির প্রধান

‘সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ভিকটিমের পরিবারবর্গের বক্তব্য ও জবানবন্দি, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের বক্তব্য ইত্যাদি পর্যালোচনা ও পারিপার্শ্বিক সার্বিক অবস্থা বিবেচনায়’ তদন্ত কমিটির মন্তব্য অংশে বলা হয়েছে, ‘৬ জন নবজাতকের আকস্মিক মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালে বর্ণিত সময়ে দায়িত্বরত চিকিৎসক না থাকা ও নার্স, স্টাফ এবং সর্বোপরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের অবহেলাজনিত বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর ঘটনায় নার্স, স্টাফ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি ‘স্পষ্টভাবে প্রমাণিত’ হয়েছে বলা হলেও মৃত্যুর কারণের ক্ষেত্রে সেটি বলা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, এটি ‘সুনির্দিষ্ট’ মৃত্যুর কারণ নয়, ‘সম্ভাব্য কারণ’। এমনকি কেবল পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য ও জবানবন্দি থেকে এই মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ বিবেচনা করেছে তদন্ত কমিটি।

যে জবাব দিয়েছে আদ্-দ্বীন
লাইসেন্স বাতিলের আগে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পরে এ নিয়ে দীর্ঘ জবাব দেয় আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের জবাবের চিঠির একটি অনুলিপি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের হাতে এসেছে। শোকজ নোটিশের জবাবে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। তাদের জবাবে বলা হয়েছে, ‘অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি প্রমাণিত নয়। অক্সিজেনের ঘাটতি (হাইপক্সিয়া) এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ, অক্সিজেন স্যাচুরেশন মাপ বা পরিবেশগত গ্যাস বিশ্লেষণের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়নি।’

এ ছাড়া এসি বন্ধ থাকা ও বিকল্প ভেন্টিলেশনের অনুপস্থিতিতে দুর্ঘটনার সম্ভাবনার ব্যাপারেও ব্যাখ্যা দিয়েছে আদ্-দ্বীন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় যে কারণ অনুমান করা হয়েছে। তাও সঠিক নয়। শীতের সময়ে ওই কক্ষে সব সময়ই এসি বন্ধ থাকে। অতীতে এমন দুর্ঘটনা ঘটেনি।’

কারণ দর্শানোর নোটিশের দেওয়া জবাবে ওই কক্ষে অতিরিক্ত ব্যক্তির উপস্থিতির বিষয়টিও অস্বীকার করা হয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে কক্ষটিতে ১৬ থেকে ২৫ জন থাকার কথা বলেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে প্রায় ৫০ জন উপস্থিত ছিল। এর জবাবে আদ্-দ্বীন বলেছে, ‘৫০ জনের উপস্থিতির যে তথ্য বলা হয়েছে, তার স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। ১১ জন রোগী, ৬ জন নবজাতকের সাথে অ্যাটেনডেন্ট যোগ করলে কোনোভাবেই ৫০ হয় না।’

চিকিৎসকের অনুপস্থিতি সম্পর্কে আদ্-দ্বীনের জবাব— ‘কোন হাসপাতালেই পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকে না। চিকিৎসকরা রাউন্ড দেবার সময় রোগীদের দেখেন এবং প্রয়োজন হলে কর্তব্যরত নার্সরা কলে থাকা চিকিৎসকদের ডাকেন। এক্ষেত্রে প্রসূতী বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রাত ১০টায় রাউন্ড দিয়েছেন। নবজাতক খারাপ হলে নবজাতক জরুরি সেবা কেন্দ্র বা এনআইসিইউতে নেওয়া হয়েছে।’

ঢাকা শহরে মাত্র ৩৫০ টাকায় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিত আদ্-দ্বীন হাসপাতাল

নার্সদের অবহেলা প্রসঙ্গে আদ্-দ্বীন বলছে, ‘দায়িত্বরত সেবিকা ও পরিচ্ছন্ন কর্মীর দায়িত্বকালীন সময়ে পেশাদারিত্বের ঘাটতির জন্য তাদেরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে নবজাতকদের আকস্মিক শারীরিক অবনতিশীল অবস্থায় হাসপাতালে সক্রিয় ইমার্জেন্সি মেডিকেল রেসপন্স ছিল না বলে যে মন্তব্য করা হয়েছে তা বাস্তবতার সাথে ভিন্ন।’

আরও পড়ুন: ৩ বছরে অর্ধেকে নেমেছে বিদেশি শিক্ষার্থী, নতুন করে বিপদে ৩০০ ভারতীয় মেডিকেল ছাত্রী

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ‘হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী, নবজাতকের শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে নবজাতক জরুরি সেবা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে প্রয়োজনে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এই হাসপাতালে এনআইসিইউ থাকায় এই সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হয়েছে। যে সমস্ত হাসপাতালে এনআইসিইউ নেই, তারা রোগীর স্বজনদের ডেকে এনআইসিইউতে নিতে বলে। এনআইসিইউ খুঁজে সেখানে বেড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে এসেছে।’

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে এ পর্যন্ত আদ্-দ্বীন প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা মুখ খোলেননি। হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস কথা বলেন। এরপর এ নিয়ে তাকেও আর কথা বলতে শোনা যায়নি।

এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ এবং বিভিন্ন সময়ে দেওয়া স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যবধান নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি যা দেওয়ার লিখিতভাবে দিয়ে দিয়েছি। এসব নিয়ে কিছু বলা আমার নিষেধ আছে।’

মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি বলে স্বীকার করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘রুমের টেম্পারেচার কি পরের দিন একই পাওয়া যাবে? যে রুমে ৫০ জন লোক ছিল, বদ্ধ ঘর ছিল, পরের দিন খালি রুমে দরজা খোলা থাকলে কি ওই টেম্পারেচার পাওয়া যাবে নাকি?’

তদন্ত প্রতিবেদন ও মন্ত্রীর বক্তব্যে মৃত্যুর কারণে ভিন্নতার প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে মুঠোফোনে প্রশ্ন করা হলে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘সম্ভাব্য না, এভাবেই মারা গেছে— এটা বলা হয়েছে। আমাদের তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে এটা।’

একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। কারণ আইনের মধ্যে থেকে যেটা, সেটাই করতে হবে, আইনের মাধ্যমেই যেতে হবে। অধিদপ্তর থেকেও যা অ্যাকশন নেওয়ার নিয়েছেমো. মহসীন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রধান ও যুগ্ম সচিব (বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা অধিশাখা), স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি কোন প্রতিবেদন জমা দেয়নি, এমন তথ্যের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডিজি অফিসের তদন্ত রিপোর্টে আছে। রিপোর্টে যা আছে, তাই জানানো হয়েছে।’