দেশের ৩৮ জেলায় নেই আইসিইউ, সিসিইউর ৯০ ভাগই ঢাকায়
দেশে নিবিড় পরিচর্যা (আইসিইউ) সেবার ঘাটতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৮ জেলাতেই কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই, আর বিদ্যমান ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে দেশের বিপুল গ্রামীণ জনগোষ্ঠী জরুরি ও সংকটাপন্ন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ডা. জোবাইদা রহমান।
আজ বুধবার (১ জুলাই) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের (বিএসসিসিএম) জাতীয় সম্মেলন ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
ডা. জোবাইদা রহমান বলেন, দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে ক্রিটিক্যাল কেয়ার শয্যা রয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭টি এবং সাধারণ হাসপাতালের শয্যা রয়েছে মাত্র ৯টি। একই সঙ্গে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৮ জেলায় কোনো আইসিইউ নেই। বিদ্যমান ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীভূত।
তিনি বলেন, দেশের ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও ক্রিটিক্যাল কেয়ার সুবিধার বেশিরভাগই বড় শহরকেন্দ্রিক। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নবজাতক, অন্তঃসত্ত্বা মা, নিউমোনিয়া বা স্ট্রোকে আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তি এবং সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীরা সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ডা. জোবাইদা রহমান আরও বলেন, সংকট শুধু আইসিইউ শয্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিশেষ করে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট ও নিউরোলজিস্টের ঘাটতির পাশাপাশি দক্ষ নার্স এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাৎক্ষণিকভাবে আইসিইউ স্থাপন করা সম্ভব না হলেও আধুনিক জীবনরক্ষাকারী সুবিধাসম্পন্ন অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
দেশের চিকিৎসকদের ভূয়সী প্রশংসা করে ডা. জোবাইদা রহমান বলেন, সীমিত অবকাঠামো ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। একটি মৃত্যু যেন কোনো পরিবারকে সর্বস্বান্ত না করে, সে জন্য সমন্বিত উদ্যোগে সারা দেশে নিবিড় পরিচর্যা সেবার পরিধি সম্প্রসারণের আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের প্রতিটি পুরোনো মেডিকেল কলেজে দ্রুত ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কোর্স চালু করা প্রয়োজন। অ্যানেস্থেসিওলজি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সব বিভাগের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, দেশে আরও অনেক আইসিইউ প্রয়োজন, এ বিষয়ে সরকারের উপলব্ধি রয়েছে। ইতোমধ্যে ১০টি জেলায় নতুন আইসিইউ চালু করা হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে আরও ইউনিট স্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বড় বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলেও জবাবদিহি ও পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নতুন আইসিইউ স্থাপনের পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব চিকিৎসকদের ওপরই বর্তায়।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যসচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, বিএসসিসিএমের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আরিফ আহসান, সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. জাফর ইকবাল, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিলসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।