রামেকের আইসিইউতে প্রথমবার ‘বায়োফায়ার’ প্রযুক্তি, ১১ মাসের শিশুর শরীরে মিলল ৪ জটিল জীবাণু
চিকিৎসাসেবায় নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানটির আইসিইউ মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে অত্যাধুনিক ‘বায়োফায়ার ফিল্মঅ্যারে’ মেশিন স্থাপনের পর প্রথম সফল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। এই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (পিআইসিইউ) চিকিৎসাধীন মাত্র ১১ মাস বয়সী এক মুমূর্ষু শিশুর শরীরে একসঙ্গে তিনটি ব্যাকটেরিয়া ও একটি ভাইরাসের (অ্যাডেনো ভাইরাস) উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে।
আজ সোমবার (২৯ জুন) দুপুরে শিশুর পরীক্ষাটি করা হয় এবং মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে এর নিখুঁত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। রামেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল নুপুর এক ফেসবুক পোস্টে এই তথ্য জানিয়েছেন।
ফেসবুক পোস্টে তিনি জানিয়েছেন, ১১ মাস বয়সী ওই শিশুটি আগে রামেক হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি ছিল। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে দেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন অভিভাবকরা। সেখানে ৫ দিনে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হলেও শিশুর স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হয়নি। নিরুপায় হয়ে পরশু দিন শিশুটিকে আবারও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে ফিরিয়ে আনা হয়।
ল্যাবে নতুন মেশিন স্থাপনের পর আজই প্রথম এই শিশুর ক্ষেত্রে ‘নিউমোনিয়া প্লাস প্যানেল পাউচ’ ব্যবহার করা হয়। দুপুর ১২টায় শিশুর ‘থ্রোট সোয়াব’ সংগ্রহ করার পর বেলা ২টাতেই রিপোর্ট হাতে পান চিকিৎসকরা।
পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যায়, শিশুটির শরীরে একই সাথে ৩টি ব্যাকটেরিয়া এবং একটি অ্যাডেনো ভাইরাস আক্রমণ করেছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, রিপোর্টে ‘রেজিস্ট্যান্স জিন’ পাওয়া গেছে, যার অর্থ হলো— প্রচলিত ও সাধারণ অনেক অ্যান্টিবায়োটিকই এখন এই শিশুর শরীরে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দ্রুত এই জীবাণু ও রেজিস্ট্যান্সের ধরণ জানতে পারায় এখন শিশুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা দেওয়া সহজ হবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
পরীক্ষার রিপোর্টটি পাওয়ার সময় আইসিইউ এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। আইসিইউ প্রধান ডা. মোস্তফা কামাল নুপুর লিখেছেন, ‘বিদেশে আমি এই পরীক্ষা করতে দেখেছি, কিন্তু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে এটা করাতে পারবো— এটা আমার কল্পনাতীত ছিল। দেশের স্বাস্থ্যসেবায় এ ধরনের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে চিকিৎসা দিতে পারলে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।’
আইসিইউ প্রধান আরও উল্লেখ করেন, এই ছোট শিশুর বাবা-মা তাদের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে সন্তানকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। সাধারণ মানুষের জন্য এই পরীক্ষাটি আরও সহজলভ্য করতে মানুষের জীবন বাঁচানোর এই সমস্ত মেশিন এবং রিএজেন্ট থেকে ভ্যাট, ট্যাক্স ও অন্যান্য কর কমাতে বা মওকুফ করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সঠিক উপায়ে বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে বর্তমান কর্তৃপক্ষ বা সরকার অবশ্যই এই প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।