২৭ জুন ২০২৬, ২০:০৮

১০ লাখ মানুষের চোখে আলো ফেরানো চিকিৎসক রবিউল হোসেন চিরঘুমে

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন  © টিডিসি সম্পাদিত

যাদের চোখের সামনে ঘনিয়ে এসেছিল চিরদিনের অন্ধকার, যারা পৃথিবীর আলো দেখার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তেমন ১০ লাখের বেশি মানুষের চোখের মণি হয়ে যিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন পৃথিবীর আলো— তিনি আর নেই। উপমহাদেশের এই বরেণ্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ, দেশের চক্ষু চিকিৎসা খাতের অন্যতম রূপকার অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন আজ শনিবার (২৭ জুন) দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে ৯০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

বার্ধক্যজনিত কারণে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার এই মৃত্যু হয়। এই প্রস্থানে দেশের চিকিৎসা ও মানবসেবার অঙ্গনে নেমেছে অপূরণীয় শোকের ছায়া।

মিরসরাইয়ের এক উদার ও সমাজসেবক দম্পতি ডা. আহমেদুর রহমান ও ওয়াহিদুন্নেসার কোল আলো করে এসেছিলেন তাদের একমাত্র সন্তান রবিউল হোসেন। পারিবারিক পরিমণ্ডলেই তার মনের ভেতর গেঁথে গিয়েছিল মানবসেবার বীজ। সেই বীজই বড় হয়ে একটি বটবৃক্ষ রূপ নেয়, যার ছায়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় ও দরিদ্র মানুষ চক্ষু চিকিৎসার অসামান্য আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল।

সত্তরের দশকে বাংলাদেশে যখন চোখ ও অন্ধত্বের আধুনিক চিকিৎসা সীমিত, তখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কষ্ট ডা. রবিউল হোসেনের হৃদয়কে নাড়া দেয়। শুধু নিজের ক্যারিয়ার বা পসার না গুছিয়ে তিনি নেমে পড়েন মাঠে। ১৯৭৩ সালে তারই উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি’। এই সমিতির ছায়ায় দেশজুড়ে শুরু হয় ভ্রাম্যমাণ চক্ষু শিবির, যার মাধ্যমে এক বা দু’জন নয়— প্রায় ১০ লাখের বেশি প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের চোখের অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়।

এছাড়া ১৯৭৫ সালে তিনি শুরু করেন এক অনন্য মানবিক উদ্যোগ— স্কুলশিক্ষার্থীদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা কর্মসূচি। এই কর্মসূচির সুবাদে এখন পর্যন্ত প্রায় আট লাখ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে চোখের যত্ন ও পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে।

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের হাত ধরেই ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ১৩০ শয্যাবিশিষ্ট ‘চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ (সিইআইটিসি) যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম আধুনিক ও সর্ববৃহৎ চক্ষু চিকিৎসা বাতিঘর হিসেবে পরিচিত।

নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের দক্ষ করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অফথালমোলজি’ প্রতিষ্ঠায়ও তার ছিল অগ্রণী ভূমিকা, যেখান থেকে ইতিমধ্যে ২৬৬ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরি হয়েছেন। এছাড়া সাধারণ মানুষের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তিনি চট্টগ্রামে গড়ে তোলেন ৩৫০ শয্যাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক ‘ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল’ এবং একটি নার্সিং ট্রেনিং সেন্টার।

কর্মযজ্ঞের সুবাদে অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন সমাদৃত ছিলেন বিশ্বব্যাপী। তিনি দুই দশকেরও বেশি সময় ‘এশিয়া প্যাসিফিক একাডেমি অব অফথালমোলজি’র জাতীয় কাউন্সিলর ও আঞ্চলিক সচিব ছিলেন। দীর্ঘ আট বছর তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেস’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে বৈশ্বিক অন্ধত্ব দূরীকরণে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

জার্মান সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘দ্য অর্ডার অব মেরিট’, আন্তর্জাতিক লাইফ লং সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড, বিএমএ অ্যাওয়ার্ড, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি এবং দ্য ডেইলি স্টার অ্যাওয়ার্ডসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শত সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন আলোর এই কারিগর।

পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, আজ শনিবার বাদ এশা চট্টগ্রামের জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল রবিবার (২৮ জুন) সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা এবং একই দিন তার জন্মস্থান মিরসরাইয়ের কাঠাছড়া এলাকায় বাদ জোহর তৃতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। মৃত্যুকালে তিনি দুই পুত্র, নাতি-নাতনি এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।