সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চলবে অ্যাপোলো-এভারকেয়ার মডেলে, কাটছে মালিকানা দ্বন্দ্বও
রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পুরোদমে চালু করতে এর মালিকানা ও পরিচালনা জটিলতা নিরসনে বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভায় খসড়া বিধিমালা ইতোমধ্যে অনুমোদনও হয়েছে। এখন অপেক্ষা জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের। আগামী সপ্তাহেই এই বিল উত্থাপনের প্রত্যাশা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এই প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণে সিংহভাগ অর্থায়ন ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার। এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতাল ভবনে এক হাজার কোটি টাকাই দেশটির বিনিয়োগ ছিল। এ ছাড়া ৩৩০ কোটি সরকার এবং অবশিষ্ট ১৭০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে বিএমইউ। হাসপাতালটি তৈরিও করেছে কোরিয়ান কোম্পানি ‘হুন্দাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি’ (এইচডিসি)। নির্মাণ ছাড়াও কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি কর্পোরেশন এর চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং কোরিয়ার সানজিন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড আর্কিটেক্টস ডিজাইন ও সুপারভিশনের দায়িত্ব পালন করেছে।
যদিও এই হাসপাতাল প্রকল্প ২০১৮ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সরকারপ্রধান হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। সে সময় থেকেই এর মালিকানা এবং পরিচালনা নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
হাসপাতালটির একাধিক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন, শুরু থেকেই অত্যাধুনিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। বিএমইউ এই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ছাড়তে চায় না। প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনও হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ দশমিক ৮ একর (প্রায় ১২ বিঘা) জমিতে। এদিকে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকেও এটিকে সরকারি হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণার দাবি রয়েছে। এর বাইরে কোরিয়ান অংশীদার পক্ষও চায় হাসপাতালটির মালিকানা ও পরিচালনায় ভাগ বসাতে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের এই মালিকানা দ্বন্দ্বের মূল কারণ প্রকল্পের সম্পদ, ভবন ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা অধিকার এবং ভবিষ্যৎ আয় বণ্টনের বিষয়গুলো। অর্থাৎ শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়, আধিপত্য— এসব ‘লাভের অংশ’।
আমাদের প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি স্কয়ার-অ্যাপোলো-এভারকেয়ার বা ইউনাইটেডের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাঙ্গেলে চলবে। এটি আর বিএমইউ হাসপাতালের মতো চলবে না—
এই দ্বন্দ্বের ফলে উদ্বোধনের প্রায় ৪ বছরেও সুপার স্পেশালাইজড এই হাসপাতালটি পুরোদমে চালু করা সম্ভব হয়নি। খোলা হয়নি মূল্যবান অত্যাধুনিক বহু যন্ত্রপাতি, যা উন্মোচিত হওয়ার আগেই বিনষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের একজন উপপরিচালক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও সুযোগ-সুবিধাসম্বলিত হাসপাতালটি অবহেলায় পড়ে আছে। এসব যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে মোড়ক খোলার আগেই। এত এত আধুনিক যন্ত্রপাতি এখানে আছে, একদিনে সব দেখা সম্ভব না। এই বিপুল সম্পদ কোনো ধরনের যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিচর্যার জন্য পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এর অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে বিএমইউর কর্তৃত্ব থাকলেও হাসপাতালটিকে বেশ ভুগতেও হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, ছোটখাটো যন্ত্রপাতি বা সামগ্রী প্রয়োজন হলে শুরু হয় চিঠি চালাচালি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজে কোনো কেনাকাটা করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সব কিছুর জন্য দেয়ালের ওপারের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। আর সেখানে চরম আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। তারা বলছেন, হাসপাতাল পুরোদমে চালু হলেও এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অত্যাধুনিক প্রতিষ্ঠানটি নিজেই নিজের সঙ্গে দৌঁড়ে উঠতে হিমশিম খাবে।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চলবে ‘অ্যাপোলো-এভারকেয়ারের আদলে’
হাসপাতাল ও বিএমইউ সূত্রে জানা গেছে, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি পুরোদমে চালু করতে এবং এসব জটিলতা নিরসন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে গত ১১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় বিএমইউ উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে আহ্বায়ক এবং হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সীকে সদস্যসচিব করে ৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা হলেন— উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আক্তার, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোস্তফা কামাল এবং প্রক্টর অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদ।
পরে ১৬ মে এক আদেশে কমিটির কার্যপরিধি নির্ধারণ করে বলা হয়, সুপার স্পোশালাইজড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থায়ীভাবে নিযুক্তদের কী করণীয় সেসব বিষয় পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে একটি প্রস্তাবনা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে মন্ত্রিপরিষদে বিষয়টি উত্থাপিত হলে তা পাসও হয়েছে।
তবে এ কমিটির সুপারিশ নিয়ে হাসপাতালে মেলেছে গুজবের ডালপালা। হাসপাতাল ও বিএমইউ কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত হওয়ার আগে সুপারিশের তথ্য সুস্পষ্ট করে বলতে চান না। আর কর্মকর্তাদের একটি অংশ বলছে, বেসরকারি কোনো কোম্পানিকে দেওয়ার সুপারিশ থাকতে পারে বিএমইউর এই কমিটির প্রতিবেদনে। এ ছাড়া একজন বিদেশি সিইও নিয়োগ দেওয়া হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।
জানিয়েছেন, বেসরকারি কোম্পানি নয়, বরং প্রস্তাবিত বিধিতে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের মূল কর্তৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেই থাকছে। তিনি বলেন, হাসপাতালের ৯০ ভাগ মালিকানা থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাকি ১০ ভাগ মালিকানা থাকছে সরকারের হাতে। তবে এর পরিচালনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে। এটি পরিচালিত হবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো— নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
এসব বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকীর কার্যালয়ে একাধিক দিন গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামাল এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। কথা বলতে চান না সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সীও।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন, বেসরকারি কোম্পানি নয়, বরং প্রস্তাবিত বিধিতে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের মূল কর্তৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেই থাকছে। তিনি বলেন, হাসপাতালের ৯০ ভাগ মালিকানা থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের। বাকি ১০ ভাগ মালিকানা থাকছে সরকারের হাতে। তবে এর পরিচালনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে। এটি পরিচালিত হবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় যাওয়া প্রসঙ্গে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা যদি এত সহজই হতো, তাহলে গত শাসনামলে তৎকালীন ভিসি প্রফেসর শারফুদ্দীনই করে যেতে পারতেন। এই প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে ওনার অনেক ক্রিডেনশিয়াল আছে। নিশ্চিত থাকেন, দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কিছুই আমাদের থেকে হবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, উপ-উপাচার্য বলেন, আমাদের কিছু মোটিভেশন আছে। বর্তমান প্রচলিত বিধিতে এটা মনে হয় হবে না, বা করা যাবে না। সেক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা কিছু পরিবর্তন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বা স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশে ফিরলে এই অধিবেশনেই বিধিমালা উঠবে। আগামী সপ্তাহেই ওঠার সম্ভাবনা আছে। মন্ত্রীসভায় পাস হয়ে গেছে। জাতীয় সংসদ যদি ওকে করে দেয়, দেন উই ক্যান লুক ফরওয়ার্ড।
তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি স্কয়ার-অ্যাপোলো-এভারকেয়ার বা ইউনাইটেডের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাঙ্গেলে চলবে। এটি আর বিএমইউ হাসপাতালের মতো চলবে না। তবে প্রাইভেট কোম্পানির কাছে নয়, এখানে সরকার এবং বিএমইউর পার্টনারশিপ থাকবে। তবে পরিচালন পদ্ধতি প্রসঙ্গে বিস্তারিত বলতে রাজি হননি উপ-উপাচার্য।