২২ জুন ২০২৬, ১৭:৫২

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ৩৫ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত মহাপরিকল্পনা, সরকারের ‘সব নীতিতে স্বাস্থ্য’

আজ সোমবার সচিবালয়ে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়  © সংগৃহীত

বাংলাদেশে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও মানসিক সমস্যার মতো অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে একযোগে মাঠে নামছে সরকারের ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। লক্ষ্য অর্জনে গঠিত উচ্চপর্যায়ের ‘সমন্বয় কমিটি’র প্রথম সভা আজ সোমবার (২২ জুন) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দেশের অকালমৃত্যুর হার কমাতে এবং সুস্থ সমাজ গঠনে ‘সব নীতিতে স্বাস্থ্য’ সংক্রান্ত বিশেষ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করেছে।

সভাপতির বক্তব্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকে সরকারের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। গতানুগতিক চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে নতুন ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

সুস্থ থাকার জন্য সর্বসাধারণের কায়িক পরিশ্রম ও হাঁটাচলার অভ্যাস গড়ে তোলার তাগিদ দিয়ে সচিব বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে মানুষ প্রতিদিন অন্তত ৩ কিলোমিটার হাঁটাচলা করে। আমাদের দেশের মানুষকে যদি বোঝানো সম্ভব হয় যে ওষুধ বা চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে জোর দেওয়া বেশি দরকার, তবেই অসংক্রামক রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশেরও বেশির জন্য দায়ী হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো অসংক্রামক রোগ। উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ মৃত্যুই অকালপ্রাপ্ত, যা দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় টেকসই উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত বছরের ২০ আগস্ট সরকারের ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের যৌথ অংশগ্রহণে একটি ঐতিহাসিক ‘যৌথ ঘোষণা’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় একটি শক্তিশালী সমন্বিত পদক্ষেপ বা ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ পদ্ধতি নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে এই সমন্বয় কমিটি গঠন করে গেজেট প্রকাশ করা হয়।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ। তিনি বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি সহায়তা প্রদানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব, সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস যৌথ ঘোষণা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে তাদের মতামত, পর্যবেক্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপস্থাপন করেন।

জানা গেছে, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সভায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়। এখন থেকে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কর্তৃক গৃহীত নীতি, কর্মকৌশল ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ‘সব নীতিতে স্বাস্থ্য’ সংক্রান্ত নীতিগত দিকনির্দেশনা কার্যকর করা হবে। বিশেষ করে, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রতিটি প্রকল্পে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। দেশব্যাপী ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরিতে সর্বাত্মক সরকারি ও সামাজিক পদ্ধতি নিশ্চিত করাসহ যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়নে প্রত্যেক মন্ত্রণালয়কে নিজস্ব খাতের উপযোগী একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

এই কর্মপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ, বার্ষিক ও মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ এবং কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে সভায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। গৃহীত পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করার জন্য সুনির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন সূচক নির্ধারণ করা হবে। মাঠপর্যায়ে বা নীতিগতভাবে যেসব চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেবে, সেগুলো চিহ্নিত করে তা নিরসনে কার্যকর নির্দেশনা দেওয়া হবে। একই সাথে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বার্ষিক সমন্বিত অগ্রগতি প্রতিবেদন মূল্যায়ন করা হবে এবং পরবর্তী বছরের অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রমসমূহ পর্যালোচনা ও অনুমোদন দেওয়া হবে।

বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জোরদার করতে আগামী এক মাসের মধ্যে সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়ন, সমন্বয় এবং অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রদানের জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হবে বলে সভা সূত্রে জানা গেছে। মনোনীত এই ফোকাল পয়েন্টদের জন্য অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে প্রমাণভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক ও ব্যয়-সাশ্রয়ী পদক্ষেপ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত নির্দেশনার বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন প্রদান করা হবে। এই কার্যক্রমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে।

এছাড়া আগামী ১ থেকে ৩ মাসের মধ্যে সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিজ নিজ খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে, যার মধ্যে বাস্তবায়ন মনিটরিং কাঠামো, পরিমাপযোগ্য সূচক এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার স্থায়ী ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।