মাসিকের সমস্যায় স্কুলে যেতে পারে না প্রতি চারজনে ১ কিশোরী: আইসিডিডিআর,বির গবেষণা
দেশের গ্রামাঞ্চলে কিশোরীদের পড়াশোনা ও নিয়মতান্ত্রিক বিদ্যালয় উপস্থিতির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাসিকজনিত (ঋতুস্রাব) বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা। তীব্র ব্যথা ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে প্রতি চারজন স্কুলগামী কিশোরীর মধ্যে একজন (২৫ শতাংশ) বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি এই শারীরিক সংকটের কারণে প্রায় ৪০ শতাংশ কিশোরীর প্রতিদিনের স্বাভাবিক পড়াশোনা ও কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সাম্প্রতিক এক দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় গ্রামাঞ্চলের কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) রাজধানীর কানাডা ক্লাবে আয়োজিত এক সেমিনারে আইসিডিডিআর,বি-র ‘অ্যাডসার্চ’ প্রকল্পের এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত রাজবাড়ীর ‘বালিয়াকান্দি হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমের (এইচডিএসএস)’ আওতায় ২ হাজার ৭১৩ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৪ মাস এই গবেষণা চালানো হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১ হাজার ২৫৫ জন স্কুলগামী ও সমবয়সী কিশোরীর মধ্যে ৬৪ শতাংশই কোনো না কোনো মাসিকজনিত সমস্যায় ভুগছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মাসিকের তীব্র ব্যথা বা ‘ডিসমেনোরিয়া’— যা দেখা গেছে ৫৬ শতাংশের শরীরে। এর মধ্যে ৯ শতাংশ কিশোরী প্রতি মাসেই ক্রনিক বা প্রতিনিয়ত এই তীব্র ব্যথায় ভোগে, যা তাদের পরীক্ষার ফল ও উপস্থিতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
গবেষকরা জানান, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (এসআরএইচআর) বিষয়ক মৌলিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, যা স্কুল পর্যায় থেকেই কার্যকর যৌন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে জরুরি করে তুলেছে।
বালিয়াকান্দির ১ হাজার ৭৭ জন ১৬ বছর বয়সী অবিবাহিত কিশোর-কিশোরীর ওপর করা পৃথক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি কিশোর (৩৪ শতাংশ) এবং ১৬ শতাংশ কিশোরী জানতই না যে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার পর মেয়েরা গর্ভবতী হতে পারে। পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সম্পর্কেও তরুণ প্রজন্মের ধারণা অত্যন্ত সীমিত। ৮৪ শতাংশ কিশোর কনডম সম্পর্কে শুনলেও কিশোরীদের মধ্যে এই হার মাত্র ৪৫ শতাংশ। এছাড়া, জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি (ইমার্জেন্সি কন্ট্রাসেপ্টিভ পিল) সম্পর্কে ৩৮ শতাংশ কিশোর জানলেও কিশোরীদের মধ্যে এ হার মাত্র ৪ শতাংশ।
অথচ পরিসংখ্যান বলছে, বিয়ের আগে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক জ্ঞান পরবর্তী জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। যেসব মেয়েরা বিয়ের আগে এ বিষয়ে জানত, তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার অন্যদের তুলনায় প্রায় অর্ধেক (১০ শতাংশের বিপরীতে মাত্র ৫ শতাংশ)।
এদিকে অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ে কিশোরীদের উপস্থিতি ধরে রাখতে এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে অনুষ্ঠানে দুটি উদ্ভাবনী প্রকল্প তুলে ধরা হয়। এর একটি হলো চাঁদপুরের মতলবে স্মার্টফোন-ভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্প এবং অন্যটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য বাংলা মোবাইল অ্যাপ ‘কৈশোর কথা’। এই অ্যাপটিতে অ্যানিমেটেড ভিডিও এবং ইনফোগ্রাফিক্সের মাধ্যমে প্রজনন স্বাস্থ্যের নানা ভুল ধারণার সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা ছাত্রীরা সহজেই ব্যবহার করতে পারবে।
আইসিডিডিআর,বি-র বিজ্ঞানী ড. ফাওজিয়া আখতার হুদার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংগঠন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ-ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের উপদেষ্টা সৈয়দ মো. নুরুদ্দীন, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর নন্দিনী লোপা, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মনজুর হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আসিফ ইকবাল।
আলোচকরা বলেন, মাসিক নিয়ে সমাজে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচলিত লোকলজ্জা ও কুসংস্কার দূর করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর তাদের কার্যক্রমে প্রাক-বৈবাহিক কাউন্সেলিং (বিয়ের আগের পরামর্শ) অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করছে বলেও জানানো হয়।
সেমিনারে বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি (ডেভেলপমেন্ট) এডওয়ার্ড ক্যাব্রেরা কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিতে ‘গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা’র প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।