১৭ জুন ২০২৬, ১০:৫৩

আদ দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল সরকারের অ্যাকশন নাকি রিঅ্যাকশন?

আদ-দ্বীন হাসপাতাল  © টিডিসি সম্পাদিত

রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার জেরে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল ও কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রণালয়ের এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তকে ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ আখ্যা দিয়ে এটি সরকারের ‘অ্যাকশন নয়, বরং রিঅ্যাকশন’ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। 

মঙ্গলবার (১৬ জুন) এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই মন্তব্য করেন। সারজিস আলম বলেন, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর মতো অব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই কাম্য নয় এবং এটি অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একই সাথে সাংবাদিকদের সাথে হাসপাতালের স্টাফদের আচরণও শাস্তির আওতায় আনা উচিত। কিন্তু এর দায়ে দেড় কোটি মানুষের চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান এক নোটিশে বন্ধ করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

ভিডিও বার্তায় সারজিস আলম হাসপাতালটির গত ২৬ বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ২০০০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ এখান থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখানে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার মানুষ বহির্বিভাগে সেবা নেন এবং প্রতিদিন নতুন করে ১৫০ থেকে ২০০ জন রোগী ভর্তি হন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ মা এখানে সন্তান প্রসব করেছেন, যার মধ্যে ১ লাখেরই নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। অথচ ঢাকার অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে সিজারের বাণিজ্য চলে এবং মৃত মানুষকে আইসিইউতে রেখে লাখ লাখ টাকা ডাকাতের মতো বিল কাটার নজির রয়েছে। সেই তুলনায় আদ-দ্বীনের সেবামূল্য অত্যন্ত সীমিত। 

তিনি বলেন, এখানে সিজারিয়ানের ক্ষেত্রে ডাক্তার, খাবার ও ওষুধসহ পুরো প্যাকেজ মাত্র ১১,০০০ টাকা, নরমাল ডেলিভারি ৪,৫০০ টাকা এবং অতি দরিদ্রদের ক্ষেত্রে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকায় এই সেবা দেওয়া হয়। এছাড়া বর্ধিত জ্বালানি মূল্যের বাজারেও মাত্র ৩৮০ টাকায় শত শত রোগীকে ঢাকা শহর জুড়ে অ্যাম্বুলেন্স সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে হাসপাতালটিতে প্রায় ৭০০টি বেড রয়েছে এবং জরুরি সেবার জন্য ১০০টিরও বেশি আইসিইউ ও এনআইসিইউ বেড সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকে।

আরও পড়ুন: দুই দশক পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: একই তারিখে সর্বকনিষ্ঠ ও বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা মেসি

প্রতিষ্ঠানটি হঠাৎ বন্ধ হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং বিপুল কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাসপাতালটির সাথে সংশ্লিষ্ট উইমেন্স মেডিকেল কলেজে বর্তমানে প্রায় ৫৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ২০০ জনই বিদেশী শিক্ষার্থী। হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় তাদের প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নার্সিং কলেজে আরও প্রায় ৪৫০ জন নার্সিং শিক্ষার্থী রয়েছেন। এছাড়া হাসপাতালটিতে কর্মরত আছেন ডাক্তার ও নার্সসহ মোট ১,৮০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, যার মধ্যে ১,৫০০ জনই নারী। অর্থাৎ, এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই ১,৮০০টি পরিবারের জীবিকাকে এক মুহূর্তে চরম সংকটে ফেলেছে।

দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে এনসিপি নেতা বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালগুলো বর্তমানে এক একটি ‘ভাগাড়’। সেখানে ডাক্তার, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ইনস্ট্রুমেন্ট নেই এবং জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে রোগী যাওয়ার সাথে সাথেই বিভাগীয় শহর বা ঢাকায় রেফার করে দেওয়া হয়। সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসকের অভাবে এর চেয়েও বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাহলে এই একই অব্যবস্থাপনার কারণে কি স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ পুরো প্রশাসনের পদত্যাগ করা উচিত? দেশে চলমান নৈরাজ্য বা ধর্ষণের ঘটনার জন্য কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা আইনমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত?

লাইসেন্স বাতিলের এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে সারজিস আলম বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখানে কোনো অ্যাকশন নেয়নি, রিঅ্যাকশন দেখিয়েছে। তারা একটা ফ্রেমিং করার চেষ্টা করেছে যে, এই প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট বেশিরভাগ মানুষ জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত, তাই এর বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেওয়া যায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো দল দেখে সেবা নিতে আসে না। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার এখন রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্নার করার চেষ্টা করছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু প্রতিষ্ঠানকে কুক্ষিগত বা বন্ধ করে অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শকে দমন-পীড়নের এই হীন চেষ্টা দিনশেষে দেশের মানুষের জন্য ভালো হবে না। তিনি সরকারকে আহ্বান জানান, একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার আগে তার চেয়ে উন্নত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দেখানোর।

ভিডিও বার্তার শেষাংশে সারজিস আলম বলেন, জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় ফ্রেমে আটকে ফেলা উচিত নয়। অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত, কিন্তু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা কোনো সমাধান হতে পারে না। মাথা ব্যথা করলে মাথা কেটে ফেলা সমাধান নয়, বরং সেটা যেন আর পুনরায় না হয় সেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তাই হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা কোনো সমাধান নয়, বরং আইনানুগ শাস্তির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এনে ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধ করাই সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত ছিল।