প্রথমবারের মতো জিডিপির ১ শতাংশের বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে স্বাস্থ্যখাত
স্বাস্থ্যখাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেট উত্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার। স্বাস্থ্যের এই বাজেট মোট জিডিপির ১.০১ শতাংশ, যেখানে গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ০.৫৮ শতাংশ। এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে ৫ হাজার চিকিৎসক ও আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা থাকছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনা এ সংক্রান্ত বাজেট উপস্থাপন করা হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট উত্থাপন করবেন।
সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছে সরকার, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বাবদ বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা।
সূত্র বলছে, বাজেটে ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি, আধুনিক ক্লিনিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থা এবং এআইভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে একটি আধুনিক, দক্ষতা-ভিত্তিক ও ভবিষ্যতমুখী নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা এবং দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগের ঘোষণা থাকছে। একই সঙ্গে দেশব্যাপী মানসম্মত ও জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে ১ লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরুর ঘোষণাও থাকছে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী।
এ ছাড়া নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ এবং নার্সিং বিষয়ে ব্যাচেলর ও মাস্টার্সের সুযোগ বৃদ্ধি করা এবং স্থানীয় ও বৈদেশিক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতিদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ৪ মাস মেয়াদি ‘জেনারেল কেয়ারগিভার’ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণের ঘোষণাও থাকছে এই বাজেটে।
সূত্র বলছে, বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যনীতির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ধরা হয়েছে— সর্বজনীন ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসা-কেন্দ্রিক থেকে প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদান জোরদারকরণ এবং স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের বিকাশ ঘটানো।
বাজেটে নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন, জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা এবং সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করে করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের ব্যবস্থা রাখার ঘোষণা থাকবে। এ ছাড়া রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবের জন্য ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় বহুল আলোচিত আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ প্রদানের ঘোষণাও থাকছে এই বাজেটে।
বাজেট ঘোষণায় আরও থাকছে সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি প্রণয়নের ঘোষণা। এ ছাড়া পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের খর্বাকৃতি মোকাবেলায় বহুমুখী ও বহু-খাতভিত্তিক একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্প পার্কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণা, বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত রাখার ঘোষণাও থাকছে এই বাজেটে। পাশাপাশি এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে ঔষধ শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশ, উদ্ভাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে প্রযোজনীয় আর্থিক প্রণোদনা ও সহাযক নীতিগত সুবিধাও রাখা হচ্ছে এতে। মূলত সরকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ও মেডিকেল ডিভাইস শিল্পকে একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পখাত হিসেবে উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
স্বাস্থ্যখাতের এবারের বাজেটে দেশব্যাপী একটি টেকসই ও আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ ও টিকা পৌঁছানো সম্ভব হয়। সীমিত আয়ের মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা কমানো, মানসম্মত ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য।