ডেঙ্গু মোকাবিলায় ‘রিঅ্যাক্টিভ’ নয়, ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’ হচ্ছে সরকার, প্রশিক্ষণ শুরু
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় বছরের প্রাথমিক ও টেকসই পদক্ষেপ হিসেবে দেশজুড়ে তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক একটি জাতীয় ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। আজ রবিবার (৭ জুন) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) শহীদ ড. মিলন হলে এই কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
উদ্বোধনী বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে ‘টোটাল ফাইট’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ডেঙ্গু এখন পুরো জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; দেশের প্রতিটি নাগরিককে এতে সম্পৃক্ত হতে হবে। সিটি করপোরেশন বা জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে শতভাগ মশা বা লার্ভা ধ্বংস করা কঠিন উল্লেখ করে তিনি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগের ওপর জোর দেন।
ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং চার মাস পর পর বুস্টার দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কারণে দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি হবে। তাই চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ এবং সঠিক চিকিৎসা প্রটোকল নিশ্চিত করার ওপরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্লাজমা লিকেজ সময়মতো শনাক্ত করা এবং রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থার ওপর সতর্ক নজর রাখা।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনির-উজ-জামানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ড. এফ এম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষা এবং প্লাজমা লিকেজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগীর শক সিন্ড্রোম ও জীবনহানির ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ম্যানেজার ড. রিয়াদ মাহমুদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এবং অনুষ্ঠানের সমন্বয়ক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হালিমুর রশিদ বক্তব্য রাখেন।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় এবার ‘রিঅ্যাকটিভ’ নয়, বরং সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ বা আগাম কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি পর্যায়ের এই প্রশিক্ষণ শেষে পরবর্তী ব্যাচে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও করপোরেট হাসপাতালের চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে এই প্রশিক্ষণ ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান। এছাড়া ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন আক্রান্ত ও ৫৭৫ জনের মৃত্যু এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন আক্রান্ত ও ৪১৩ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে, যা প্রমাণ করে ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশে একটি সারা বছরব্যাপী স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।