২৭ মে ২০২৬, ১৪:২৫

মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নিভে গেল ছোট্ট প্রাণ, শিশুটির দুই ছবি কাঁদাচ্ছে সবাইকে

বামে শিশুটির জীবিত ছবি এবং বামে নিথর মরদেহ  © টিডিসি ফটো

পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র একদিন বাকি ছিল। পরিবারের সবার স্বপ্ন ছিল, নবজাতক শিশুটিকে নিয়ে এবারের ঈদ হবে আনন্দের, হবে নতুন জীবনের উৎসব। রাতেও ফুটফুটে শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের সব কষ্ট ভুলে ছিলেন মা। কিন্তু সেই রাত পেরোতেই বদলে যায় সবকিছু। ভোরের আলো ফোটার আগেই নিভে যায় ছোট্ট প্রাণটি। হাসপাতালে সন্তান হারিয়ে বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ।

রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক ওয়ার্ডে মারা যাওয়া ছয় নবজাতকের মধ্যে ছিল এই শিশুটিও। জন্মের পর বাইরের পৃথিবীর আলো দেখারও সুযোগ হয়নি তার। হাসপাতালের কক্ষেই কেটেছে জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টা। অভিযোগ উঠেছে, ওয়ার্ডের এসি লিকেজ বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই অসুস্থ হয়ে পড়ে একের পর এক নবজাতক। পরে মৃত্যু হয় ছয় শিশুর।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা ছয় নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে তাদের মৃত্যু হয়।

সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের করিডোরজুড়ে তখন শুধুই স্বজনদের কান্না আর আহাজারি। এর মধ্যেই শিশুদের কাপড়ে মোড়ানো নিথর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন এক বাবা। মুখে কোনো শব্দ নেই, চোখে শুধু টপটপ করে ঝরছিল অশ্রু। বারবার নিথর শিশুটির মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে সন্তানকে ঘিরে ছিল পরিবারের ঈদের স্বপ্ন, ভোর হতেই সেই সন্তানই পরিণত হয়েছে নিথর দেহে।

আরও পড়ুন: মধ্যরাতে হঠাৎ চিৎকার শুরু করে বাচ্চাগুলো, ভোর হতে না হতেই না ফেরার দেশে সবাই! লাশের সারিতে এক-দুই দিন বয়সী শিশুও

এদিকে সন্তান হারানো আরেক মা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘রাতে ওই ওয়ার্ডের প্রায় সব শিশুই একসঙ্গে অস্বাভাবিক কান্না ও অনবরত বমি করছিল। আমরা মায়েরা কেউ-ই প্রথমে বুঝতে পারিনি আসলে ভেতরে কী ঘটছে। সকালে আমার শিশুর অবস্থা মারাত্মক খারাপ হলে তাকে তড়িঘড়ি করে বাইরে নেওয়া হয়। পরে এনআইসিইউতে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা প্রথমে আমাদের আশ্বস্ত করলেও কিছু সময়ের মধ্যেই ভেতর থেকে চিরতরে মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়।’

তিনি জানান, ওয়ার্ডে প্রায় ১২ থেকে ১৩টি শিশু ছিল এবং তার আশঙ্কা, বিষাক্ত কোনো কারণে অধিকাংশ শিশুই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।

হাসপাতালে আরেক শিশুর দাদি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘চিকিৎসকেরা যদি হাসপাতালের ভেতরের পরিস্থিতি সামাল দিতে না-ই পারতেন, তাহলে আমাদের আগেভাগে অন্য হাসপাতালে চলে যেতে বলা উচিত ছিল। তারা আমাদের মিথ্যা আশা দিয়ে নাতনিকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে বলে জানায়। ওদিকে ওষুধ কেনার জন্য আমাদের পকেট থেকে কয়েক হাজার টাকা খরচও করানো হয়। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষার পর ভেতরে গিয়ে জানতে পারি, আমাদের কলিজার টুকরো শিশুটি আর বেঁচে নেই।’

ভোরে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। গ্যাসলাইনে লিকেজ বা অন্য কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। রমনা থানা পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টি তদন্ত করছে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, ছয় নবজাতক শিশুসহ ১১ জন মা ওই পোস্ট অপারেটিভ রুমে অবস্থান করছিলেন। ঠাণ্ডা অনুভূত হওয়ায় এক নবজাতকের মা এসি বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেন। পরে নার্স প্রায় এক ঘণ্টার মতো এসি বন্ধ রাখেন। এরপর গরম অনুভূত হওয়ায় আবার এসি চালু করা হলে প্রথমে দুই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর বাকি চার শিশুও অসুস্থ হয়ে যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় শিশুর মৃত্যু হয়।

তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইম টিম কাজ করছে এবং আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিস্তারিত তদন্ত শেষে জানানো হবে।

এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বুধবার (২৭ মে) দুপুরে হাসপাতালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান।

তিনি বলেন, “হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে আমরা তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটির সদস্যদের তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।”

হাসপাতালের মহাপরিচালক (হসপিটালস অ্যান্ড নার্সিং) অধ্যাপক ডা. নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, যে ওয়ার্ডে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে ১১ জন মা ও ছয়জন সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু ছিলেন। শিশুদের বয়স ছিল এক থেকে দুই দিনের মধ্যে। সিজারের পর নিয়মিতভাবেই ওই ওয়ার্ডে মা ও নবজাতকদের রাখা হয়।

তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ডটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় অনেক সময় রোগী বা স্বজনেরা অতিরিক্ত ঠাণ্ডার অভিযোগ করে এসি বন্ধ রাখতে বলেন। এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে।’

ডা. নাহিদা ইয়াসমিন জানান, রাত তিনটার পর দুটি শিশু অসুস্থ বোধ করলে তাদের নিউ নেটাল আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, শিশুরা ভালো আছে। পরে তাদের আবার ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, “ভোর ছয়টার পর দায়িত্বরত নার্স ও মায়েরা দেখতে পান, শিশুদের অবস্থা আবার খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এরপর ছয় নবজাতককেই নিউ নেটাল আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর দুই শিশুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বাকি চার শিশুকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তাদেরও বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”