২১ মে ২০২৬, ১৯:৪২

বিএমইউতে প্রসূতি মায়েদের থাইরয়েড চিকিৎসার সর্বাধুনিক নির্দেশিকার উদ্বোধন

সেমিনারে অতিথিরা  © সংগৃহীত

দেশে গর্ভাবস্থায় ও প্রসবোত্তর সময়ে থাইরয়েড রোগ ব্যবস্থাপনায় প্রথমবারের মতো সর্বাধুনিক চিকিৎসা নির্দেশিকা (গাইডলাইন) প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার (২০ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে থাইরয়েড টাস্কফোর্স ও ‘বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির (বিইএস) যৌথ উদ্যোগে এই গাইডলাইনের উদ্বোধন করা হয়। আগামী বিশ্ব থাইরয়েড দিবসকে সামনে রেখে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যকর্মীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই বিশেষ বৈজ্ঞানিক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘থাইরয়েড স্বাস্থ্য রক্ষায় সঠিক পুষ্টি’।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, নতুন এই চিকিৎসা নির্দেশিকাটি দেশের ইভিডেন্স বেইসড মেডিসিন প্রাকটিসে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে জন্মের পরপরই নবজাতকের থাইরয়েড পরীক্ষাসহ দ্রুত রোগ নির্ণয়ের ওপর আমাদের জোর দিতে হবে।

সেমিনারে চিকিৎসকেরা জানান, নতুন এই নির্দেশিকাটি অনুসরণ করলে গর্ভাবস্থায় থাইরয়েডের জটিলতা নিরসন, অকাল প্রসব, গর্ভপাত, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমানো এবং সুস্থ সন্তান জন্মদান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের চিকিৎসকদের জন্য এটি একটি হাতে-কলমে দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

সেমিনারে নিনমাস পরিচালক ও বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী জানান, এখন দেশে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ও মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো রকম কাঁটাছেঁড়া ছাড়াই শুধু সুইয়ের সাহায্যে থাইরয়েডের টিউমার অপসারণ করা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে রোগীকে অজ্ঞান করার বা হাসপাতালে ভর্তি থাকার প্রয়োজন পড়ে না। এতে খরচও অনেক কম এবং কোনো বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এই ‘টিউমার অ্যাবলেশন’ পদ্ধতি দেশের মানুষের থাইরয়েড ও লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসায় বড় অবদান রাখবে। তিনি জীবনের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে—জন্মের পরপরই, বয়ঃসন্ধিকালে, মায়েদের গর্ভধারণের পূর্বে এবং ৫০ বছর বয়সের পর থাইরয়েড স্ক্রিনিং করার তাগিদ দেন।

বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির (বিইএস) সভাপতি ডা. ফারিয়া আফসানার সভাপতিত্বে সেমিনারে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা ও পুষ্টির গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। চিকিৎসকেরা জানান, গলার নিচের অংশে অবস্থিত প্রজাপতি আকৃতির এই গ্রন্থিটি শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া, হৃদস্পন্দন ও শিশুদের মানসিক বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। হরমোন কম তৈরি হলে (হাইপোথাইরয়েডিজম) ক্লান্তি ও ওজন বৃদ্ধি পায়, আর বেশি তৈরি হলে (হাইপারথাইরয়েডিজম) বুক ধড়পড়ানি ও হাত কাঁপার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য শরীরে আয়োডিন (সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুগ্ধজাত পণ্য), সেলেনিয়াম (মুরগির মাংস, সূর্যমুখীর বীজ), জিঙ্ক (গরুর মাংস, ডাল, ছোলা), আয়রন ও ভিটামিন ডি অত্যন্ত জরুরি।

সেমিনারে বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি ও সয়াবিনের মতো গয়ট্রোজেনিক খাবার নিয়ে সতর্ক করা হয়, যা শরীরে আয়োডিন শোষণে বাধা দেয়। তবে এগুলো ভালোভাবে রান্না করে খেলে ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমে যায়, তাই রোগীরা পরিমিত পরিমাণে রান্না করা সবজি খেতে পারবেন। পাশাপাশি ক্যাফেইন, অ্যালকোহল, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলার এবং দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিইএসের প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট ডা. শাহজাদা সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক ডা. এম সাইফুদ্দিন। এছাড়া বিশেষ অতিথি ছিলেন বারডেমের পরিচালক (একাডেমি) অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক পাঠান। প্যানেল অব এক্সপার্ট হিসেবে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ডা. এম এ হাসনাত, অধ্যাপক ডা. শেখ জিনাত আরা নাসরীন এবং অধ্যাপক ডা. মো. হাফিজুর রহমান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডা. সৈয়দ আজমল মাহমুদ। সেমিনারে সংশ্লিষ্ট সকল চিকিৎসক ও গবেষকদের থাইরয়েড রোগ প্রতিরোধে ব্যাপকভিত্তিক গবেষণার আহ্বান জানানো হয়।