১৯ মে ২০২৬, ১৮:৩৫

দেশে থাইরয়েড আক্রান্তদের ৬০ ভাগই চিকিৎসার বাইরে, প্রতি ৭ রোগীর ৫ জন নারী

সেমিনারে অতিথিরা  © সংগৃহীত

বাংলাদেশে থাইরয়েড গ্রন্থির নানা সমস্যা ও রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশই এখনো কোনো ধরনের চিকিৎসা সেবার আওতায় আসেননি। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ এ রোগে ভুগলেও তাদের একটি বড় অংশই জানেন না যে তারা এই নীরব ঘাতক ব্যাধিতে আক্রান্ত। এছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি; প্রতি ৭ জন থাইরয়েড রোগীর মধ্যে ৫ জনই নারী।

আগামী ২৫ মে বিশ্ব থাইরয়েড দিবস ও আন্তর্জাতিক থাইরয়েড সচেতনতা সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নিনমাসে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনা ও বৈজ্ঞানিক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়। বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির উদ্যোগে এই সেমিনার আয়োজিত হয়। এ বছর থাইরয়েড দিবসের প্রতিপাদ্য হলো— ‘জানুন, পরীক্ষা করুন, জয় করুন’ এবং ‘আপনার থাইরয়েড, আপনার রক্ষক’।

সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ থাইরয়েড সোসাইটির সভাপতি ও নিনমাসের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী।

আরও পড়ুন: স্বাস্থ্যের মতো ‘অনিরাপদ ক্যাডার’ আর নেই— ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন’ বাস্তবায়নের দাবি এনডিএফের

আলোচকরা থাইরয়েড গ্রন্থির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সাইজে ছোট হলেও কাজে এটি অনেক বড়। থাইরয়েডের জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। তবে রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হলে মানবদেহের বড় ধরনের অপূরণীয় ক্ষতিসহ প্রাণহানির শঙ্কাও রয়েছে।

অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল বারী তার বক্তব্যে জানান, থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন মানুষের শরীরের বিপাক হার, হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, ওজন এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই গ্রন্থিতে সমস্যা দেখা দিলে হাইপোথাইরয়েডিজম, হাইপারথাইরয়েডিজম, গলগণ্ড ও থাইরয়েড ক্যানসারের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হয়।

বংশগত ও শিশু স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে তিনি বলেন, মা-বাবার থাইরয়েড সমস্যা থাকলে সন্তানের তা হওয়ার সম্ভাবনা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত থাকে। বর্তমানে প্রতি ২ হাজার ৩০০ শিশুর মধ্যে ১ জন জন্মগত থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছে। এছাড়া প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ সাব-ক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত, যাদের সিংহভাগই নিজেদের রোগ সম্পর্কে অসচেতন।

আরও পড়ুন: অপুষ্টি ও মায়ের দুধ না পাওয়ায় শিশুদের হামের ঝুঁকি বাড়ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

তিনি মানবজীবনের চারটি বিশেষ সময়ে— জন্মের পরপরই, বয়ঃসন্ধিকালে, মায়েদের গর্ভধারণের পূর্বে এবং ৫০ বছর বয়সের পর অবশ্যই থাইরয়েড স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।

সেমিনারে থাইরয়েড চিকিৎসায় রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ও মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির মতো নতুন এবং আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির কথা জানানো হয়। এই পদ্ধতিতে কোনো রকম কাটাছেঁড়া ও রোগীকে অজ্ঞান করা ছাড়াই শুধুমাত্র সুইয়ের মাধ্যমে থাইরয়েড টিউমার অপসারণ করা সম্ভব। এতে রোগীকে হাসপাতালেও ভর্তি থাকতে হয় না, খরচ কম এবং কোনো বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এই টিউমার অ্যাবলেশন পদ্ধতি দেশের মানুষের থাইরয়েড ও লিভার ক্যানসারের চিকিৎসায় বড় অবদান রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানে বিএমইউর উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার থাইরয়েড সচেতনতাকে প্রাথমিক হেলথ কেয়ারে অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানান। এন্ডোক্রাইন সোসাইটির প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, একটি মেধাবী ও সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিশ্চিত করতে এবং সুস্থ মাতৃত্ব গঠনে থাইরয়েড রোগ দ্রুত শনাক্তকরণ ও আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি সতর্কতার সাথে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

বিএমইউর নাক-কান-গলা বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সাত্তার জানান, সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে থাইরয়েড ক্যানসার প্রায় শতভাগ নিরাময় সম্ভব। এছাড়া মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লব নবজাতকদের জন্মের পরপরই থাইরয়েড পরীক্ষা করানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, অধ্যাপক ডা. ফওজিয়া মোসলেম, অধ্যাপক ডা. এম এ করিম, ডা. এম সাইফুদ্দিন এবং অধ্যাপক ডা. জীনাত জাবীন প্রমুখ।