১৮ মে ২০২৬, ১৩:৩৭

কঙ্গোয় ছড়াচ্ছে নতুন প্রজাতির ইবোলা, উগান্ডাতেও সংক্রমণ; ডব্লিউএইচও’র সতর্কতা

ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী   © সংগৃহীত

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাসকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা (পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন) হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবকে এখনই 'মহামারি' (প্যান্ডেমিক) বলা যাবে না। এই প্রদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৪৬ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে ডব্লিউএইচও সতর্ক করে বলেছে, বর্তমানে যে পরিমাণ রোগী শনাক্ত ও রিপোর্ট করা হচ্ছে, বাস্তবে এই প্রাদুর্ভাব তার চেয়ে "অনেক বেশি বড়" হতে পারে। সেই সঙ্গে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে এটি মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাস্থ্য সংস্থাটি জানায়, ইবোলার বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি মূলত 'বুন্দিবুগিও'  ভাইরাসের কারণে হচ্ছে, যার জন্য এখন পর্যন্ত অনুমোদিত কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই।

এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, পেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং গলা ব্যথা। পরবর্তীতে বমি, ডায়রিয়া, চামড়ায় র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি এবং রক্তপাত শুরু হতে পারে।

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত আটজনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়া এবং স্বর্ণখনির শহর হিসেবে পরিচিত মঙ্গওয়ালু ও রুয়ামপারা—এই তিনটি স্বাস্থ্য জোনে আরও অনেক সন্দেহভাজন রোগী ও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

এমনকি দেশের রাজধানী কিনশাসাতেও একজনের শরীরে এই ভাইরাস নিশ্চিত হওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আক্রান্ত ব্যক্তি ইতুরি প্রদেশ থেকে সেখানে ফিরেছিলেন।

ডব্লিউএইচও আরও জানায়, ভাইরাসটি ইতিমধ্যে ডিআর কঙ্গোর সীমানা পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দুজনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। উগান্ডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার উগান্ডায় মারা যাওয়া ৫৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তির পরীক্ষার ফল পজিটিভ এসেছে।

উগান্ডা সরকারের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মারা যাওয়া ব্যক্তি কঙ্গোর নাগরিক ছিলেন এবং তাঁর মরদেহ ইতিমধ্যে ডিআর কঙ্গোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

এদিকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি (AFP) রবিবার জানিয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর গোমা-তেও ল্যাব টেস্টে একজনের ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। শহরটি বর্তমানে এম২৩ (M23) বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস (CBS) সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গোতে অন্তত ছয়জন মার্কিন নাগরিক ইবোলার সংস্পর্শে এসেছেন। তাদের মধ্যে একজনের শরীরে লক্ষণ দেখা দিলেও এখনো কারোর আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্ট্যাট নিউজ (STAT News) রিপোর্ট করেছে, মার্কিন সরকার তাদের সেখান থেকে সরিয়ে সম্ভবত জার্মানির একটি সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, তারা ডিআর কঙ্গো এবং উগান্ডায় আরও কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে, ডিআর কঙ্গোয় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস একটি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করে তাদের নাগরিকদের ইতুরি প্রদেশে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সিডিসির সাথে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।

আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মহাপরিচালক জিন কাসেয়া সতর্ক করে বলেছেন, যেহেতু কোনো ভ্যাকসিন বা কার্যকর ওষুধ নেই, তাই মানুষকে অবশ্যই জনস্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে। বিশেষ করে যারা এই রোগে মারা যাচ্ছেন, তাদের শেষকৃত্য বা দাফন-কাফন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে দেওয়া নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের 'নিউজডে' অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, "আমরা চাই না শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান থেকে মানুষ নতুন করে সংক্রমিত হোক।"

উল্লেখ্য, এক দশকেরও বেশি সময় আগে ঘটে যাওয়া বড় প্রাদুর্ভাবটির শুরুর দিকে অনেকে সংক্রমিত হয়েছিলেন পারিবারিক ও সামাজিক শেষকৃত্যের মাধ্যমে, যেখানে প্রিয়জনের মরদেহ ধৌত করতে গিয়ে মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হন।

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, ডিআর কঙ্গোতে চলমান নিরাপত্তাহীনতা ও মানবিক সংকট, মানুষের ব্যাপক যাতায়াত, ঘনবসতিপূর্ণ শহর এলাকায় ভাইরাসের উপস্থিতি এবং ওই অঞ্চলে অনানুষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের (লাইসেন্সহীন বা লোকাল ক্লিনিক) আধিক্য রোগটি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াতের কারণে ডিআর কঙ্গোর সীমান্তবর্তী দেশগুলো উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

রুয়ান্ডা জানিয়েছে, তারা "সতর্কতামূলক ব্যবস্থা" হিসেবে ডিআর কঙ্গোর সাথে তাদের সীমান্তে নজরদারি ও স্ক্রিনিং জোরদার করছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়েছে এবং কোনো রোগী দেখা মাত্রই দ্রুত শনাক্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য দলগুলো প্রস্তুত রয়েছে।

ডব্লিউএইচও পরামর্শ দিয়েছে যে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা (ট্রেসিং) এবং সংক্রমণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে ডিআর কঙ্গো ও উগান্ডার জরুরি পরিচালন কেন্দ্র (ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার) স্থাপন করা উচিত।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, নিশ্চিত হওয়া রোগীদের অবিলম্বে আইসোলেশনে (বিচ্ছিন্নকরণ) নিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে। যতক্ষণ না ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি বুন্দিবুগিও ভাইরাস-নির্দিষ্ট টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসে, ততক্ষণ তাদের আইসোলেশনে রাখতে হবে।

যেসব দেশের সীমান্ত আক্রান্ত অঞ্চলের সাথে লেগে আছে, সেসব দেশের সরকারকে নজরদারি ও স্বাস্থ্য বিষয়ক রিপোর্টিং বাড়াতে বলা হয়েছে।

তবে ডব্লিউএইচও যোগ করেছে যে, আক্রান্ত অঞ্চলের বাইরের দেশগুলোর সীমান্ত বন্ধ করা বা ভ্রমণ ও বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত নয়। কারণ "এ ধরনের পদক্ষেপ সাধারণত ভীতি থেকে নেওয়া হয়, যার পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।"

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রাদুর্ভাবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এবং এটি ভৌগোলিকভাবে কতটা ছড়িয়েছে, তা নিয়ে বর্তমানে "মারাত্মক অনিশ্চয়তা" রয়েছে।

ইবোলা কী এবং এটি কীভাবে ছড়ায়?
এই প্রাদুর্ভাবের কারণ কী? ইবোলা একটি ভাইরাসজনিত রোগ—এটি বিরল, তবে অত্যন্ত গুরুতর এবং প্রায়শই প্রাণঘাতী। ইবোলা ভাইরাসের তিনটি প্রজাতি রয়েছে যা প্রাদুর্ভাব ঘটায়। বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি 'বুন্দিবুগিও' প্রজাতির ভাইরাসের কারণে হচ্ছে।

ইবোলা কীভাবে ছড়ায়? এটি আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরল, যেমন—রক্ত এবং বমির মাধ্যমে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়ায়।

এটি কতটা মারাত্মক? বুন্দিবুগিও ইবোলা ভাইরাসের আগের প্রাদুর্ভাবগুলোতে আক্রান্তদের প্রায় ৩০% মানুষ মারা গেছেন।

লক্ষণ প্রকাশের সময়কাল (ইনকিউবেশন পিরিয়ড) কত? সংক্রমিত হওয়ার পর সাধারণত ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে শরীরে লক্ষণ দেখা দেয়।

লক্ষণগুলো কী কী? প্রাথমিক লক্ষণগুলো হঠাৎ করেই দেখা দেয় যা অনেকটা ফ্লু বা সাধারণ জ্বরের মতো; যেমন—জ্বর, মাথাব্যথা এবং তীব্র ক্লান্তি। রোগটি বাড়ার সাথে সাথে বমি ও ডায়রিয়া শুরু হয় এবং শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ঠিকমতো কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কিছু রোগীর শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তপাতও হতে পারে।

ইবোলা কোথা থেকে আসে? ফলখেকো বাদুড়ের (ফ্রুট ব্যাট) মতো সংক্রমিত বন্য প্রাণীর কাছ থেকে মানুষের শরীরে ইবোলা আসার মাধ্যমে এই প্রাদুর্ভাবের সূচনা হয়।

এর কি কোনো ভ্যাকসিন আছে? ইবোলার 'জায়ার' (Zaire) প্রজাতির জন্য ভ্যাকসিন থাকলেও, এই 'বুন্দিবুগিও' প্রজাতির জন্য কোনো ভ্যাকসিন নেই।

আজ থেকে ৫০ বছর আগে ১৯৭৬ সালে বর্তমান ডিআর কঙ্গোতেই প্রথম ইবোলা ভাইরাস আবিষ্কৃত হয় এবং ধারণা করা হয় এটি বাদুড় থেকে ছড়িয়েছিল। দেশটিতে এই মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগের এটি ১৭তম প্রাদুর্ভাব।

ইবোলার নিশ্চিত কোনো নিরাময় বা চিকিৎসা নেই। ডব্লিউএইচও-এর মতে, এই রোগে গড় মৃত্যুর হার প্রায় ৫০%।

আফ্রিকা সিডিসি এর আগে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিল যে, রুয়াম্পারা ও বুনিয়ার মতো শহুরে পরিবেশ এবং মঙ্গওয়ালুর খনি অঞ্চলের কারণে এই ভাইরাস আরও ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. জিন কাসেয়া আরও জানান, আক্রান্ত এলাকা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে "প্রচুর মানুষের যাতায়াত" থাকায় আঞ্চলিক সমন্বয় রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

গত ৫০ বছরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৫,০০০ মানুষ এই ভাইরাসে মারা গেছেন।

ডিআর কঙ্গোতে ইবোলার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, যখন প্রায় ২,৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

এছাড়া গত বছরও দেশটির একটি দুর্গম অঞ্চলে প্রাদুর্ভাবের ফলে ৪৫ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন।