হান্টা ভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যা বলছে
আটলান্টিক মহাসাগরে ‘এমভি হন্দিয়াস’ নামক একটি প্রমোদতরীতে হান্টা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এই সংক্রমণে জাহাজের ৩ জন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন এবং আক্রান্ত সন্দেহে আরও ৩ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছে, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কম।
প্রমোদতরীতে সংক্রমণ ও বর্তমান পরিস্থিতি
প্রমোদতরী ‘এমভি হন্দিয়াস’-এ হান্টা ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ বলেছেন, ‘এমভি হন্দিয়াস’ নামের জাহাজটি থেকে উদ্ধারকৃত ওই তিন ব্যক্তিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে পাঠানো হয়েছে।’
সংস্থাটির তথ্যমতে, এই প্রমোদতরীতে আক্রান্ত সন্দেহে থাকা ৮ জনের মধ্যে ৫ জনের দেহে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ডব্লিউএইচও প্রধান আশ্বস্ত করেছেন, জাহাজটি স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে ভিড়লেও সেখানকার সাধারণ মানুষের জন্য সংক্রমণের ঝুঁকি কম। স্পেন এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম এবং সংস্থাটি তাদের সব ধরণের সহায়তা দিচ্ছে।
হান্টা ভাইরাস ও এর ভিন্ন ভিন্ন রূপ
হান্টা ভাইরাস মূলত একগুচ্ছ ভাইরাসের সমষ্টি, যা সাধারণত ইঁদুর বা এ জাতীয় ক্ষুদ্র প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ইঁদুরের লালা, মল-মূত্র বা এদের বাসস্থানের ধূলিকণার সংস্পর্শে মানুষ এলে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’ প্রতিবেদনে লিখেছে, ভৌগোলিক অবস্থানভেদে এ ভাইরাসের সংক্রমণের ধরন ও লক্ষণে ভিন্নতা দেখা যায়।
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় এ ভাইরাসের কারণে ‘হান্টাভাইরাস কার্ডিওপালমোনারি সিনড্রোম’ বা এইচসিপিএস নামের রোগ হয়, যা সরাসরি শ্বাসতন্ত্র বা ফুসফুসকে আক্রমণ করে। এ নির্দিষ্ট ধরনে আক্রান্ত রোগীদের প্রায় অর্ধেকই মারা যেতে পারে। অন্যদিকে, ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশে এটি ‘হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম’ বা এইচএফআরএস তৈরি করে, যা দেহের রক্তনালী ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন।
যেভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস
সাধারণত সংক্রমিত ইঁদুরের লালা, মল বা মূত্র থেকে নির্গত ভাইরাস নিশ্বাসের মাধ্যমে দেহে প্রবেশ করলে এই সংক্রমণ ঘটে। সরাসরি স্পর্শ ছাড়াও আক্রান্ত প্রাণীর বর্জ্য মিশ্রিত ধূলিকণা বা বাতাস ফুসফুসে প্রবেশের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। ইঁদুরের কামড়ের মাধ্যমেও সংক্রমণ হতে পারে, তবে তা সচরাচর ঘটে না।
লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এর বিশেষজ্ঞ রজার হিউসন এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ঠিক এ কারণে কোনো ব্যক্তির আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ দেখা দিলে তদন্তের ক্ষেত্রে একটি বিষয়েই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তি ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে এমন কোনো পরিবেশ, খাদ্য গুদাম, জাহাজের কেবিন, স্টোরেজ এরিয়া বা অন্য কোনো বদ্ধ জায়গার সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না। সাধারণত হান্তাভাইরাস একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের দেহে সহজে ছড়িয়ে পড়ার মতো ভাইরাস হিসেবে বিবেচিত নয়।’
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর কমিউনিকেবল ডিজিজেস’-এর তথ্য অনুসারে, জাহাজ থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের দেহে ‘আন্দেস ভাইরাস’ শনাক্ত হয়েছে, যা মানুষ থেকে মানুষেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আন্দেস ভাইরাসের ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ কেবল দীর্ঘ সময় ধরে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকলে ঘটে থাকে।
লক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ মতামত
হান্টা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত জ্বর, পেশিতে ব্যথা ও প্রচণ্ড মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এটি একটি মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি যা সঠিক সময়ে শনাক্ত না হলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে পারে।
প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহতা নিয়ে ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম টেইলর বলেছেন, ‘এ প্রাদুর্ভাব নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। হান্টাভাইরাস সাধারণত মানুষের মাধ্যমে নয়, বরং প্রাণীর শারীরিক বর্জ্যের সংস্পর্শে এলে ছড়ায়। বর্তমানে জাহাজে ঝুঁকি কমানোর জন্য যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সেগুলো কেবল সতর্কতামূলক পদক্ষেপ মাত্র।’
বিশেষজ্ঞ রজার হিউসন আরও জানিয়েছেন, একই জাহাজের একাধিক ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার মানে এই নয় যে তারা জাহাজের ভেতরেই সংক্রমিত হয়েছেন। তারা যাত্রাপথে কোনো দ্বীপে নামার সময় বা পরিবেশগত অন্য কারণেও আক্রান্ত হতে পারেন। তাই ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক জানিয়েছেন, ‘হান্টাভাইরাসের সুপ্তিকাল (ইনকিউবেশন পিরিয়ড) ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হতে পারে, তাই আগামীতে আরও অনেকে আক্রান্ত হওয়ার খবর আসতে পারে।’ তবে পরিস্থিতি মূল্যায়নে সামগ্রিক ঝুঁকি এখনও কম বলেই মনে করছে সংস্থাটি।