এবার পুরুষদের জন্য ‘গর্ভনিরোধক’ তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা!
জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত পদ্ধতিতে দীর্ঘকাল ধরে নারীদের ওপর নির্ভরতা থাকলেও এবার পুরুষদের জন্য নিরাপদ ও শতভাগ কার্যকরী ‘গর্ভনিরোধক’ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা।
নিউ ইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দীর্ঘ ছয় বছর ইঁদুরের ওপর গবেষণার পর এমন একটি হরমোনবিহীন ও সাময়িক পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতায় স্থায়ী কোনো ক্ষতি করবে না।
সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এ এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, ক্যানসার গবেষণায় ব্যবহৃত একটি যৌগকে কাজে লাগিয়ে শুক্রাণু উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা সম্ভব এবং এটি অস্ত্রোপচারমুক্ত একটি সহজ প্রক্রিয়া।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদেহে শুক্রাণু তৈরির প্রক্রিয়া অর্থাৎ ‘মায়োসিস’-এর একটি নির্দিষ্ট ধাপে বাধা দিলে শুক্রাণু উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। এর জন্য ‘জেকিউ১’ নামক একটি যৌগ ব্যবহার করা হয়েছে, যা শুক্রাণু উৎপাদনে বাধা দিলেও শরীরের অন্য কোনো ক্ষতি করে না। কর্নেল রিপ্রোডাক্টিভ সায়েন্সেস সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক পলা কোহেন জানান, ‘অণ্ডকোষে গর্ভনিরোধক স্থাপন যে শুক্রাণু উৎপাদন রোধের একটি কার্যকরী উপায় হতে পারে, আমরাই তা প্রথম দেখালাম। এতে কোনো স্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনে স্বাভাবিক মায়োসিস প্রক্রিয়া এবং শুক্রাণুর সম্পূর্ণ কার্যকারিতা ফিরে পাওয়া সম্ভব। এই প্রক্রিয়ায় গর্ভনিরোধক ব্যবহার করার পর কোনো পুরুষ চাইলে সফল ভাবে সন্তান উৎপাদন করতে পারবেন। সন্তানের স্বাস্থ্যও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকবে।’
বর্তমানে পুরুষদের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণের একমাত্র স্থায়ী পদ্ধতি ‘ভ্যাসেকটমি’ বা অস্ত্রোপচার। এর বাইরে কেবল কনডমের ব্যবহার প্রচলিত থাকলেও তা শতভাগ নিরাপদ নয়। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, তারা শুক্রাণুর মূল কোষ বা স্টেম সেলগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কেবল উৎপাদন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন।
পল কোহেন বলেন, ‘আমরা স্পার্মাটোগোনিয়াল স্টেম সেলগুলিকে প্রভাবিত করতে চাইনি। কারণ, সেগুলিকে মেরে ফেললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলবেন।’ এই পদ্ধতিতে শুক্রাণু উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যা প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
গবেষণাগারে ইঁদুরের ওপর তিন সপ্তাহ ধরে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেখা গেছে, তাদের শুক্রাণু উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে প্রয়োগ বন্ধ করার মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যেই ইঁদুরগুলো পুনরায় স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষমতা ফিরে পায় এবং সুস্থ সবল শাবক জন্ম দেয়। গবেষকদের মতে, মানুষের শরীরের ক্ষেত্রে এটি প্রতি তিন মাস অন্তর ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
দীর্ঘদিনের বহু কাঙ্ক্ষিত এই আবিষ্কার জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি যৌন স্বাস্থ্যের নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।