২৭ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৪

ঋতুস্রাবের রক্তেই মিলছে রোগের হদিশ: নারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় আসছে নতুন বিপ্লব

প্রতীকী ছবি   © সংগৃহীত

ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড যা দীর্ঘদিন ধরে কেবল একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়েছে সেটিই এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের মাসিকের রক্ত বিশ্লেষণ করে শরীরের নানা জটিল রোগ ও শারীরিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা সম্ভব।

এন্ডোমেট্রিওসিস, জরায়ুর ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড সমস্যা, ভিটামিনের ঘাটতি এমনকি পরিবেশ দূষণের প্রভাব সবকিছুরই ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে এই রক্ত থেকে। ফলে ভবিষ্যতে নারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

যা বলছেন বিজ্ঞানীরা
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বায়োটেক স্টার্টআপ ইতোমধ্যে পিরিয়ডের রক্ত নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা শুরু করেছে। তাদের লক্ষ্য হলো অস্ত্রোপচার বা জটিল পরীক্ষার বদলে সহজ, কম খরচে এবং কম কষ্টদায়ক উপায়ে রোগ নির্ণয় করা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাসিকের রক্তে প্রায় ৩৮৫ ধরনের প্রোটিন থাকে। এছাড়া এতে হরমোন, ব্যাকটেরিয়া, এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু এবং প্রজনন অঙ্গের বিভিন্ন কোষ থাকে। ফলে এটি এক ধরনের 'প্রাকৃতিক বায়োপসি' হিসেবে কাজ করে, যা জরায়ুর ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেয় যা সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় সবসময় পাওয়া যায় না।

এন্ডোমেট্রিওসিস শনাক্ত
বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯ কোটি নারী এন্ডোমেট্রিওসিসে ভুগছেন, যা একটি দীর্ঘস্থায়ী ও যন্ত্রণাদায়ক রোগ। এতে জরায়ুর টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায় এবং তীব্র ব্যথা, ভারী মাসিক, এমনকি বন্ধ্যাত্বও হতে পারে। এই রোগ শনাক্ত করতে বর্তমানে ৫ থেকে ১২ বছর সময় লেগে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপি (অস্ত্রোপচার পদ্ধতি) প্রয়োজন হয়। গবেষকদের মতে, পিরিয়ডের রক্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই রোগ অনেক দ্রুত ও সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। কারণ এতে জরায়ুর কোষ ও প্রদাহজনিত পরিবর্তনের সরাসরি তথ্য পাওয়া যায়।

শুধু প্রজনন নয়, আরও বহু রোগের ইঙ্গিত
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মাসিকের রক্ত থেকে ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় থাইরয়েডের হরমোনের ভারসাম্য বোঝা সম্ভব অটোইমিউন রোগ (যেমন লুপাস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস) শনাক্তের সম্ভাবনা রয়েছে পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম ও বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় এমনকি কিছু গবেষণায় মাসিকের রক্তে পরিবেশ দূষণকারী রাসায়নিক (যেমন প্যারাবেন, ফেনল) শনাক্ত হয়েছে, যা শরীরের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

ঘরে বসেই পরীক্ষার সম্ভাবনা
বর্তমানে কিছু স্টার্টআপ বিশেষ প্যাড, ট্যাম্পন বা মাসিক কাপ ব্যবহার করে নমুনা সংগ্রহের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে মাসিকের রক্ত ব্যবহার করে ডায়াবেটিস বা সংক্রমণ শনাক্তের পরীক্ষাও চালু হয়েছে। গবেষকদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ঘরে বসেই সহজ কিট ব্যবহার করে নারীরা নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পেতে পারবেন।

গবেষণায় পিছিয়ে থাকার কারণ
এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মাসিকের রক্ত নিয়ে গবেষণা দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। এর পেছনে অন্যতম কারণ সামাজিক ট্যাবু ও নারী স্বাস্থ্য গবেষণায় কম বিনিয়োগ। বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা গবেষণার খুব অল্প অংশই নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যয় করা হয়। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি অনেকদিন অজানাই থেকে গেছে।

গবেষকরা বলছেন, পিরিয়ডের রক্ত নিয়ে গবেষণা এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিভিন্ন দেশে মাসিক রক্তের বায়োব্যাংক গড়ে তোলা হচ্ছে এবং বড় পরিসরে গবেষণার প্রস্তুতি চলছে। যদি এই প্রযুক্তি সফল হয়, তাহলে নারীরা দ্রুত রোগ নির্ণয়, উন্নত চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সুযোগ পাবেন। এতে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত নারীর স্বাস্থ্যখাতে এক নতুন বিপ্লব ঘটতে পারে।

 সূত্র: বিবিসি