চিকিৎসায় অবহেলায় মৃত্যু, ১০ চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত
বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসায় অবহেলায় ৪ জনের মৃত্যু ও একজনের ভুল প্রতিবেদন দিয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করার ঘটনায় ১০ চিকিৎসকের পূর্ণ রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। আজ রবিবার (১ মার্চ) বিএমডিসি রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. লিয়াকত হোসেন স্বাক্ষরিত পৃথক নোটিশে তাদের রেজিস্ট্রেশন স্থগিতের তথ্য জানানো হয়।
পূর্ণ রেজিস্ট্রেশন স্থগিত হওয়া চিকিৎসকরা হলেন— রাজধানীর মালিবাগের জে এস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিক্যাল চেকআপ সেন্টারের চিকিৎসক ডা. ইশতিয়াক আজাদ, ডা. মাহবুব মোরশেদ ও ডা. এস এম মুক্তাদির, বাড্ডার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. তাসনুভা মাহজাবীন ও ডা. সৈয়দ সাব্বির আহমেদ, ঝিনাইদহের শৈলকুপা প্রাইভেট শিশু হাসপাতাল ও ছন্দা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের ডা. তৌহিদুর রহমান ও ডা. সোহেলী ইসলাম এবং টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের আলোক হেলথ কেয়ারের ডা. মেরিনা জেসমিন, ডা. মো. শাইখুল আরাফাত ও ডা. মো. এছহাক আলী।
এর মধ্যে ইশতিয়াক আজাদ ও এস এম মুক্তাদিরের ২ বছর এবং তৌহিদুর রহমান ও ডা. সোহেলী ইসলামের ১ বছরের জন্য রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করা হয়েছে। বাকিদের রেজিস্ট্রেশন স্থগিত হয়েছে ৬ মাসের জন্য।
নোটিশগুলোতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের ৫৪ তম কাউন্সিল সভায় এসব চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের দায় প্রমাণিত হওয়ায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন-২০১০ (৬১ নং আইন)-এর ধারা ২৩(১) এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল প্রবিধানমালা-২০২২-এর বিধান ৩৬(৪)(খ) অনুযায়ী বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের রেজিস্টার হতে তাদের নিবন্ধন নম্বর বাতিলপূর্বক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের নাম সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
জানা গেছে, জে এ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সুন্নাতে খাৎনা করাতে গিয়ে ২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শিশু আহনাফ তাহমিদ আয়হামের (১০) মৃত্যু হয়। আয়হাম আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল। তার ফুপা মোতাহার হোসেন ওই সময়ে অভিযোগ করেন, তার বাবার অনুমতি না নিয়েই ছেলেটিকে ফুল অ্যানেসথেশিয়া দেওয়া হয়েছিল। তিনি বারবার লোকাল অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার কথা বললেও তারা তার কথা শোনেনি। উল্টো তাকে ধমক দিয়ে বলে, ডাক্তারের চেয়ে বেশি বুঝলে নিজেই খৎনা করান। এমনকি আয়হাম মারা যাওয়ার পরও তার পরিবারের সদস্যদের প্রথমে জানানো হয়নি। আধা ঘণ্টা পরও অপারেশন থিয়েটারের দরজা না খোলায় এক পর্যায়ে তারা দরজা ধাক্কাতে থাকেন। পরে দরজা খুললে তারা আয়হামের লাশ দেখতে পান। রাত দুইটার পর লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় আয়হামের বাবা থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ ডা. এস এম মুক্তাদির ও মাহবুব মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠালে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়ে।
একই বছরের ৭ জানুয়ারি বাড্ডায় ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খাৎনা করাতে গিয়ে আয়ান (৫) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। ওই শিশুটিও ফুল অ্যানেসথেশিয়ার কারণে মারা যায় বলে অভিযোগ। ঘটনার পর হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
একই বছরে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় নিবন্ধনহীন অবৈধ ক্লিনিক শৈলকুপা প্রাইভেট হাসপাতাল ও ছন্দা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ান অপারেশনে মারা যান রিয়া খাতুন (২০) নামে এক প্রসূতি। এই ঘটনার অল্প কিছুদিন আগে সুখজান নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয় ওই প্রতিষ্ঠানটিতে।
অপরদিকে ২০২১ ও ২২ সালে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ভুল প্রতিবেদন দিয়ে জামাল হোসেন (৪২) নামে এক দিনমজুরের অর্থ হাতিয়ে নেন ডা. মেরিনা জেসমিন, ডা. মো. শাইখুল আরাফাত ও ডা. মো. এছহাক আলী। জানা গেছে, কোমর ও পেটে ব্যথা অনুভব করায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর আলোক হেলথ কেয়ারে আল্টাসনোগ্রাফি করান জামাল হোসেন। আল্টাসনোগ্রাফি করেন ডা. মো. শাইখুল আরাফাত। পরের বছর ৪ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার একই ক্লিনিকে আবারও জামাল খানের আল্টাসনোগ্রাফি করেন ডা. মেরিনা জেসমিন। দুবারই আল্টাসনোগ্রাফি প্রতিবেদনে ধরা পড়ে তার পিত্তথলিতে পাথর হয়েছে।
চিকিৎসকরা পাথর অপসারণে অপারেশন করার পরামর্শ দেন। কিন্তু হাতে টাকা না থাকায় তা আর করা সম্ভব হয়নি। পরে ধার করে টাকা সংগ্রহ করে ২ জুলাই ঘাটাইল ডিজিটাল ক্লিনিকে ভর্তি হন পিত্তথলির অপারেশনের জন্য। কিন্তু অপারেশন করতে গিয়ে ডা. আবু ইসহাক জানান, তার পিত্তথলিই নেই। ডা. আবু ইসহাক জানান, অপারেশনের সময় রোগীর পিত্তথলি দেখতে না পেয়ে রোগীর স্বজনদের ডেকে তা দেখানো হয়। তাহলে অপারেশন করা হল কেন— এমন প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, আল্টাসনোগ্রাফির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে অপারেশন করা হয়। ওই সময় জামাল হোসেন অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ আলোক হেলথ কেয়ার তার কাছে থেকে প্রায় ২৫ হাজার টাকা নিয়েছে।