২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০১

ঘুম থেকে উঠেই মন খারাপ হয় কেন, কিসের ইঙ্গিত?

সকালে ঘুম থেকে উঠে মন বিষণ্নতা  © সংগৃহীত

সকালে ঘুম ভাঙার পর বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করে না, কোনো কাজে মন বসে না, সবকিছু কেমন যেন মনে হয়। অথচ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাটতে থাকে মন খারাপ। এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন অনেকে। এটি নিয়মিত হলে তা শুধু ক্লান্তি বা অলসতার বিষয় নয়, বিষণ্নতারও লক্ষণ হতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যের এই সমস্যাটি ‘মর্নিং ডিপ্রেশন’ নামে পরিচিত। এতে দিনের অন্য সময়ের তুলনায় সকালে বিষণ্নতা, হতাশা, বিরক্তি ও ক্লান্তি লাগে বেশি। তবে এটি আলাদা কোনো রোগ নয়; বরং বিষণ্নতার একটি সম্ভাব্য উপসর্গ।

ঘুমের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটলে এই সমস্যার দেখা দিতে পারে। সঠিক সময়ে ঘুমানো, নিয়মিত জীবনযাপন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা নেওয়ার মাধ্যমে এ ধরনের উপসর্গ দূর করা সম্ভব।

সকালে মন খারাপের কারণ কী:
মানবদেহের ঘুম, জেগে থাকা, কর্মশক্তি ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণে একটি অভ্যন্তরীণ সময়ব্যবস্থা কাজ করে। এটি 'সার্কাডিয়ান রিদম' বা দেহঘড়ি নামে পরিচিত। এই ছন্দে ব্যাঘাত ঘটলে ঘুমের ধরন, মনোযোগ, কর্মক্ষমতা ও মানসিক অবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। এ ক্ষেত্রে কর্টিসল ও মেলাটোনিনের মতো হরমোনও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হলে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে ক্লান্তি, বিরক্তি ও মন খারাপের অনুভূতি বাড়তে পারে। তবে সকালে মন খারাপের পেছনে ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপসহ অন্য কারণও থাকতে পারে।

যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
মর্নিং ডিপ্রেশনে সকালে ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছেড়ে উঠতে কষ্ট হওয়া, দিনের শুরুতেই ক্লান্তি কাজ করে, গোসল করা বা নাশতা বানানোর মতো সাধারণ কাজেও অনীহা দেখা দেয়। এছাড়া চিন্তাভাবনা ধীর হয়ে আসা বা মাথা ঝাপসা লাগা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

কীভাবে বুঝবেন, চিকিৎসা প্রয়োজন কি না?
সকালে মন খারাপের পাশাপাশি যদি দীর্ঘদিন ধরে কোনো কাজে আগ্রহ না থাকে, ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাস বদলে যায় কিংবা স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দিনের বিভিন্ন সময়ে মেজাজের পরিবর্তন, ঘুমের ধরন, মনোযোগ এবং দৈনন্দিন অভ্যাস সম্পর্কে জানতে চাইতে পারেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বিষণ্নতা বা অন্য কোনো সমস্যার সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হয়।

মন খারাপ কমাতে কী করবেন?

নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো: প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও সকালে ওঠার অভ্যাস করুন। ছুটির দিনেও রুটিন ধরে রাখার চেষ্টা করুন।

নিয়মিত খাবার খাওয়া: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এড়িয়ে চলুন।

ঘুমের পরিবেশ ঠিক রাখা: শোবার ঘর অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক রাখুন। পর্যাপ্ত রাতের ঘুম নিশ্চিত করুন এবং দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমানো এড়িয়ে চলুন।

চা-কফি ও ধূমপানে সতর্কতা: বিশেষ করে দিনের শেষভাগে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ধূমপান ও অ্যালকোহলও ঘুমের মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নিয়মিত শরীরচর্চা: হাঁটা বা হালকা ব্যায়ামের মতো শারীরিক কার্যক্রম দৈনন্দিন রুটিনে রাখুন। ঘুমানোর ঠিক আগে কঠোর ব্যায়াম না করাই ভালো।

এসব অভ্যাস দেহঘড়ির স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে বিষণ্নতার উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র হলে শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কীভাবে হয় চিকিৎসা:
উপসর্গের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী মর্নিং ডিপ্রেশনের চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক ধরনের পদ্ধতির পরামর্শ দিতে পারেন।

মনোচিকিৎসা: কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি)সহ বিভিন্ন ধরনের মনোচিকিৎসা নেতিবাচক চিন্তা, মানসিক চাপ ও সম্পর্কজনিত সমস্যা মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।

ওষুধ: বিষণ্নতার ধরন ও তীব্রতা বিবেচনায় চিকিৎসক অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ দিতে পারেন। নিজের সিদ্ধান্তে এসব ওষুধ শুরু, বন্ধ বা পরিবর্তন করা উচিত নয়।

আলোকচিকিৎসা: বিশেষ ধরনের উজ্জ্বল আলো ব্যবহার করে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। এটি মূলত মৌসুমি বিষণ্নতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলেও কিছু ক্ষেত্রে অন্য ধরনের বিষণ্নতার উপসর্গেও উপকার হতে পারে।

ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপি: বিষণ্নতার কিছু গুরুতর ক্ষেত্রে, বিশেষ করে অন্যান্য চিকিৎসায় পর্যাপ্ত সাড়া না মিললে, বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে এ পদ্ধতি বিবেচনা করা হয়।

অবহেলা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা:
সকালে মাঝেমধ্যে মন খারাপ হওয়া মানেই বিষণ্নতা নয়। কিন্তু দিনের শুরুতে মন খারাপ যদি নিয়মিত ঘটে এবং দীর্ঘদিন ধরে জীবনযাপনে প্রভাব ফেলে, তাহলে তা উদ্বেগের কারণ।

[সূত্র:হেল্থলাইন]